‘অন্তঃস্থ আতঙ্কে’ ‘ঘুম হারাম এনবিআর কর্মকর্তাদের

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫

‘রাতে ঘুমাতে গেলাম, সকালে উঠে দেখলাম বরখাস্ত বা বদলি হয়ে গেছি’—এভাবেই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “কমবেশি সবাই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কেউ সরাসরি, কেউ ব্যাচমেটদের মাধ্যমে। তাই এখন সবার মধ্যেই একধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করছে।”

ইতোমধ্যে এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, কেউ বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন, কেউ বদলির মুখে। এনবিআর ভবনের ভেতরে এখন বিরাজ করছে আতঙ্ক, চাপা কানাঘুষা ও অনিশ্চয়তা। অনেকে মুখ খুলতে চাইছেন না, সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন।

বরখাস্ত ও অনুসন্ধানে কারা কারা

তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এনবিআরের ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ৪ জনকে। দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। আন্দোলনের পর থেকে অন্তত ১০০ জনকে বদলি করা হয়েছে।

১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে বরখাস্ত হয়েছেন ২৩ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ১৬ জুলাইই বরখাস্ত হয়েছেন ৯ জন। রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ফাঁসের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব ও উপকর কমিশনার মুকিতুল হাসানকে। অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ট্যারিফ আলোচনা সংক্রান্ত একটি গোপন নথি তিনি সাংবাদিকের হাতে তুলে দেন, যা ভিত্তিতে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

বুধবার দুপুরে এনবিআর ভবনে উপস্থিত ছিলেন মুকিতুল হাসান। বিকেলে বরখাস্তের আদেশ জারি হয়। তাকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।

১৬ জুলাই বরখাস্ত হওয়া বাকি কর্মকর্তারা হলেন—কর অঞ্চল-২ এর কর পরিদর্শক লোকমান হোসেন, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর পরিদর্শক নাজমুল হাসান ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ছালেহা খাতুন সাথী ও রৌশনারা আক্তার, কর অঞ্চল-১৪ এর প্রধান সহকারী বিএম সবুজ, ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা দক্ষিণের সিপাই সালেক খান, কর অঞ্চল-১০ এর নিরাপত্তা প্রহরী মো. সেলিম মিয়া (হোয়াটসঅ্যাপে এনবিআর চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে)

এর আগে, ১৫ জুলাই বরখাস্ত হন আরও ১৪ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার (সংগঠনের সভাপতি), অতিরিক্ত কমিশনার মির্জা আশিক রানা, এনএসডব্লিউ প্রকল্প পরিচালক সিফাত-ই-মরিয়ম, এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব মো. শাহাদাত জামিলসহ আরও অনেকে।

একই দিন সকালে বরখাস্ত হন কর অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যায়ের ৮ কর্মকর্তা, যেমন—কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, কক্সবাজার, রংপুর, কুমিল্লা ও ঢাকার কর্মকর্তারা।

গেল মে মাসে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে ভাগ করে: রাজস্ব নীতিরাজস্ব ব্যবস্থাপনা। এই অধ্যাদেশ ঘিরে এনবিআরের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। গঠিত হয় ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’। তাদের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়—কলম বিরতি, কালো ব্যাজ, সর্বশেষ ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি।

চাপের মুখে সরকার পরে জানায়, সংশোধনী না আসা পর্যন্ত এনবিআরের কার্যক্রম আগের কাঠামোতেই চলবে। এরপর আন্দোলন কিছুটা থামে। তবে চলমান তদন্ত ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপে কর্মকর্তাদের মধ্যে আবারও উদ্বেগ দেখা দেয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, যারা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, তাদের কেউই ছাড় পাবেন না। একাধিক বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি এনবিআরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। গণক্ষমার আবেদন করলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বরং আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতেই বোর্ড কাজ করছে।

১৬ জুলাই দুপুরে আগারগাঁওয়ের এনবিআর ভবনে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কে কখন বরখাস্ত বা বদলি হচ্ছেন—এই ভাবনায় অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সূত্র মতে, গ্রেফতারের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এক কর্মকর্তা জানান, “যাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। দোষী প্রমাণিত হলে চূড়ান্ত বরখাস্ত হবেন তারা। তবে তারা আপিল করতে পারেন কিংবা আদালতের শরাণাপন্ন হতে পারেন।”

প্রসঙ্গত, এনবিআরের চলমান সংকট নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে ৯ সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর দায়িত্ব, আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনবিআর শিগগিরই আরও বড় পরিসরে রদবদল ও ব্যবস্থা নিতে পারে।

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD