কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, প্রখ্যাত গোরখোদক (কবর খননকারী) মনু মিয়া আর নেই। শনিবার (২৮ জুন) সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর।
কাজের প্রয়োজনেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হতো তাঁকে। এই যাতায়াতে তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ছিল একটি ঘোড়া। বহু বছর ধরে সেই ঘোড়ায় চড়ে এলাকায় কবর খুঁড়তে যেতেন তিনি। গ্রামবাসী জানায়, মনু মিয়াকে ঘোড়া ছাড়া কল্পনাও করা যেত না। অনেকেই ভালোবেসে তাঁকে ডাকতেন “ঘোড়াওয়ালা গোরখোদক” নামে।
কিছুদিন আগে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন মনু মিয়া। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় তাঁর প্রিয় ঘোড়াটি।
ঘোড়াটিকে হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। তবে তখন মনু মিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে তার পরিবার বিষয়টি তাঁকে জানায়নি।
ঢাকায় চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন মনু মিয়া। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ঘোড়ার মৃত্যুর খবর জানানো হয়। ঘোড়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক ছিল মনু মিয়ার। এই মৃত্যুসংবাদে তিনি চুপসে যান, বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে। স্থানীয়রা জানান, এরপর থেকেই তার মনোবল আরও ভেঙে পড়ে।
শনিবার সকালে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই পরিশ্রমী ও ধর্মভীরু মানুষটি। তার মৃত্যুতে আলগাপাড়া গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শুধু তার পরিবার নয়, গোটা ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্ধ। এলাকাবাসী বলছে, তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কেউ মারা গেলে তাকে কবর খোঁড়ার অনুরোধ জানাতে হতো না—তিনি নিজেই আগে হাজির হতেন।
আলগাপাড়ার মসজিদের ইমাম বলেন, “মনু ভাই কেবল গোরখোদক ছিলেন না, ছিলেন একজন আশীর্বাদ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি মানুষের পাশে ছিলেন।”
এক প্রতিবেশী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা হয়তো অনেক উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু মনু ভাইয়ের মতো একজন মানুষের অবদান, সেবা—তাকে কোন মাপে ফেলব বুঝতে পারি না।”
শনিবার বিকেলে আলগাপাড়া গ্রামের কবরস্থানে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়। যারা জীবদ্দশায় তার হাতে প্রিয়জনের কবর খোঁড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন, তারাই আজ চোখের জলে বিদায় জানান সেই নিরলস সেবককে।