মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে—এমনটাই মনে করছেন প্রতিরক্ষা ও কৌশল বিশ্লেষকরা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত অন্তত এক ডজন মার্কিন ঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘাঁটি এখন আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে উল্টো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এগুলো এখন শত্রুপক্ষের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক আধিপত্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলেন, ইরানের পাল্টা হামলা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের একজন উল্লেখ করেন, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এখন অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তার মতে, এই অঞ্চলে পুনরায় শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কৌশলগত উদ্দেশ্যও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৯টি স্বীকৃত সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন আছে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’—এই নীতির ভিত্তিতে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় অনেকটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
ইরানকে প্রতিহত করতে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জায়গায় বিমানবন্দর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এমনকি জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও হামলার শিকার হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সুবিধার চেয়ে ঝুঁকি বেশি তৈরি করছে। অতীতের বিভিন্ন হামলার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, এই অঞ্চলে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বরাবরই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে এসেছে।
আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলো আর নিরাপত্তার জন্য এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক দেশ নিজেদেরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে মনে করছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যদি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে ঝুঁকতে পারে—যার মধ্যে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি—যেখানে শক্তির ভারসাম্য, জোটরাজনীতি এবং নিরাপত্তা কৌশল—সবকিছুই পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।





