উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মেধা পাচার, দেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে

Screenshot_3-2509060338.jpg
মো: আল মামুন নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে মেধা পাচার ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সেরা প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে প্রায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন, গবেষণা এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকট তৈরি হচ্ছে। গত দুই দশকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর গড়ে অর্ধ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়তে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ অন্তত ৫৭টি দেশে। শুধু বিদেশে পড়াশোনার খরচেই প্রতি বছর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে শিক্ষাগ্রহণ শেষে উন্নত জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানের লোভে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর দেশে ফিরছেন না। ফলে জনগণের টাকায় তৈরি দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি ব্যাচের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস শুরু করছেন। সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকেও প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও চাকরির জন্য দেশ ছাড়ছেন।

সংখ্যায় বৃদ্ধি

২০০৫ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন ১৫,০০০ শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৫২,৭৯৯ জনে (ইউনেসকো তথ্য)। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ২০১১-১২ সালে ছিল ৩,৩১৪ জন, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭,০৯৯ জনে। এক দশকে এই সংখ্যা সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মেধা পাচারের মূল কারণ, চাকরির নিম্ন বেতন ও অনুন্নত কর্মপরিবেশ, দক্ষতা অনুযায়ী সুযোগ না পাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘুষ ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, মেধাবীর যথাযথ মূল্যায়নের অভাব। শিক্ষা কনসালট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা সেলিম রায়হান বলেন, “যেখানে মেধার মূল্য নেই, সেখানে তরুণরা বিদেশে ভালো সুযোগের খোঁজে চলে যেতেই বাধ্য হয়।” শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া তানিয়া আহমেদ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষক নিয়োগে বাদ পড়েন। বর্তমানে তিনি সুইডেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছেন।

‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪’ জরিপে দেখা যায়, ১৮–৩৫ বছর বয়সিদের মধ্যে ৫৫ শতাংশই সুযোগ পেলে বিদেশে যেতে চান। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ না করলে দেশ তিন ধরনের বড় ক্ষতির মুখে পড়বে—
১. জাতি দক্ষ মানবসম্পদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে
২. তারা দেশে অর্থ পাঠাবেন না
৩. তাদের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজরা অর্থ পাচারের পথ খুঁজে নেবে

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন (সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী): “ট্যালেন্ট পুল” গঠন করতে হবে। সরকার খরচ বহন করবে, তবে শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরতে হবে। এতে রিভার্স ব্রেন ড্রেন সম্ভব হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক: “চীন ও ভারতের মতো বিদেশে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে সুযোগ না থাকলে মেধাবীরা চিরতরে হারিয়ে যাবে।” বাংলাদেশে মেধা পাচার এখন ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদি দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হয়, তবে জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানবসম্পদ—চিরস্থায়ীভাবে বিদেশে হারিয়ে যাবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে গভীর সংকটে ফেলবে।

Leave a Reply

scroll to top