বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ

আশ্রয়ের আশায় পৃথিবীর দরজায়

New-Project-19-3.jpg

বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ

আজ ২০ জুন। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে এই দিনটি উদযাপন করে আসছে—তাদের সম্মানে, যারা যুদ্ধ, নির্যাতন, নিপীড়ন কিংবা রাজনৈতিক সংকটের কারণে নিজেদের দেশ, ঘর, সমাজ—সবকিছু পেছনে ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছে অজানা গন্তব্যে।

বিশ্বজুড়ে শরণার্থীর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা UNHCR-এর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি। যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিই শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত—অর্থাৎ তারা অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইউক্রেন, সুদান, কঙ্গো—প্রতিটি অঞ্চল আজ রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী।

রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশে শরণার্থীর বাস্তবতা

বিশ্ব শরণার্থী দিবস বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক এখনো ‘অস্থায়ী’ শিবিরে বন্দি জীবনযাপন করছেন। তারা এসেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর একটি ভয়াবহ জাতিগত নিধনের মুখে। সেই থেকে বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিলেও, পরিস্থিতি আজ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জীবনের এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এখন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, বরং রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত সংকটেও রূপ নিচ্ছে। প্রায় ৭ বছর কেটে গেলেও এখনো কোনো কার্যকর প্রত্যাবাসনের রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অনেকাংশে কমে এসেছে। ফলে শরণার্থী দিবস রোহিঙ্গাদের জন্য শুধুই একটি স্মরণ, তাদের দুর্ভোগের আরেকটি অধ্যায়।

আশ্রয় নয়, মর্যাদার সন্ধান

বিশ্ব শরণার্থী দিবস শুধু একটি ক্যালেন্ডারের দিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়—শরণার্থীরা কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, তারা মানুষ। তাদের প্রয়োজন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, প্রয়োজন মর্যাদা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

রোহিঙ্গা শিশুরা আজ জন্ম নিচ্ছে অনিশ্চয়তার মাঝে। তারা জানে না ‘ভবিষ্যৎ’ কেমন। কেউ চায় শিক্ষক হতে, কেউ চায় চিকিৎসক; কিন্তু নাগরিকত্বহীনতার কারণে তাদের সেই স্বপ্নগুলো ক্রমেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ একে ‘ভূতপূর্ব সঙ্কট’ আখ্যা দিলেও বাস্তবতা আরও জটিল: স্বেচ্ছাপ্রবাস, স্থায়ী পুনর্বাসন বা মর্যাদার প্রত্যাবাসন—তিনটি পথই এখন কার্যত অবরুদ্ধ।

বাংলাদেশ মানবিকতার সর্বোচ্চ নজির স্থাপন করলেও, এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থী দীর্ঘদিন ধরে বহন করা একটি অস্বাভাবিক চাপ। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয় অনেক। শুধুমাত্র অর্থ বা ত্রাণ দিয়ে নয়—রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমারকে একটি টেকসই ও মর্যাদাসম্পন্ন প্রত্যাবাসনের দিকে ঠেলে দিতে হবে।

দিনটি হোক শপথের: ‘আমরাও মানুষ’

বিশ্ব শরণার্থী দিবসে শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন দায়িত্ববান অংশগ্রহণ। কণ্ঠ তুলে বলতে হবে—শরণার্থীদের আরেকটি সংখ্যা নয়, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের অধিকার আছে শিক্ষা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, জীবনের। বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আজও অন্ধকার, তবে আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগ ও চাপই হতে পারে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সেতুবন্ধ।

এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—শরণার্থীরাও মানুষ। তারা আশ্রয় খোঁজেন বটে, কিন্তু স্বপ্নও দেখেন।

Leave a Reply

scroll to top