প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “জুলাই বিপ্লব কেবল একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না, এটি ছিল সমাজজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈষম্য, অনিয়ম ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ।” তিনি বলেন, “যারা রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন—তাদের ঋণ শোধের একমাত্র উপায় হলো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা।”
রোববার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা’ বিষয়ক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, ইতোমধ্যে দুইটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, যা পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমাদের সংস্কারযাত্রা শুরু হয়েছে। এটি কোনো কসমেটিক সংস্কার নয়—বরং এটি এমন একটি মূলগত রূপান্তর, যা গত ৫৪ বছরেও ঘটেনি।”
বিচারব্যবস্থার সংস্কার:
প্রধান উপদেষ্টা জানান, বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর ও স্বাধীন করতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:
-
বিচার বিভাগে নিজস্ব সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব
-
উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি
-
জেলা আদালতে বিচারকদের বদলির জন্য নির্দিষ্ট বিধি
-
বিচার প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি
-
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরায় সক্রিয়করণ—বিচারপতিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে
তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে একটি গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা আইন মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির প্রস্তাবনার ব্যাপক মিল থাকায় একটি অভিন্ন লক্ষ্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
‘গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্রের সুযোগ’ বন্ধে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন:
প্রধান উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, “আমরা দেখেছি কীভাবে নির্বাচনের নামে কৌশলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হয়, প্রশাসন ভেঙে দেওয়া হয়। তাই দরকার নতুন শক্ত কাঠামো, যার কেন্দ্রে থাকবে একটি স্বাধীন, দক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক বিচারব্যবস্থা।”
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশ একটি রূপান্তরের দোরগোড়ায়। আমরা যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারি, তাহলে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব—যেখানে স্বাধীনতা, সমতা ও মর্যাদা থাকবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নীতির কেন্দ্রে।”
জুলাই বিপ্লব স্মরণ ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার:
আসন্ন জুলাই বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী সামনে রেখে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “প্রায় এক বছর হতে চলল, যখন আমাদের তরুণরা রক্ত দিয়ে নতুন স্বপ্ন লিখে দিয়েছিল। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের কাঁধে।”
তিনি আরও বলেন, “এটাই আমাদের একবারের সুযোগ। যদি আমরা তা হাতছাড়া করি, তাহলে এটি আর ফিরে নাও আসতে পারে। আমাদের অঙ্গীকার হোক—এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেবো।”
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বক্তব্য রাখেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন এবং সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।





