সৌরশক্তিতে বদলাবে ছাদ, বদলাবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে সৌর প্যানেল বসানোর প্রকল্পের ছবি
মুহাম্মদ নূরে আলম

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক যুগ আগেও যেটা ছিল সংকটে জর্জরিত, আজ তা বিস্তৃত এক পরিসরে দাঁড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রামে, পৌর এলাকা থেকে প্রত্যন্ত চরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে, কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের চিত্রটা দিনকে দিন বদলে যাচ্ছে। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেড়েছে নির্ভরতা আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির উপর, অন্যদিকে টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধির ফলে চাপ বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। এই সংকট থেকে উত্তরণে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের তাগিদ নতুন নয়, কিন্তু সম্প্রতি সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে—স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর নির্দেশ—তা বাস্তব প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ।

মধ্য-জুনে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে, সকল সরকারি ও আধা-সরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নির্দেশনা অনুসারে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে, এই উদ্যোগ শুধুই পরিবেশবান্ধব নয়, বরং আর্থিকভাবে টেকসই এবং বিদ্যুৎ খাতে নির্ভরতা হ্রাসে কার্যকর।

প্রথমেই যা বোঝা দরকার, তা হলো—ছাদভিত্তিক সৌরশক্তির ধারণাটি নতুন নয়। অনেক দেশেই এটি ব্যাপকভাবে চালু রয়েছে, বিশেষ করে ভারত, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও চীন এই পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। বাংলাদেশের মতো জনঘনত্বপূর্ণ এবং সূর্যপ্রভায় সমৃদ্ধ দেশে এটি একটি লজিক্যাল ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেটি যথেষ্ট জটিল।

প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহারের উপযোগী নয়—অনেকে আগেই সেসব জায়গা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছে, কেউ আবার ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ভারবহনে সক্ষম নয়। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি ভবনের ছাদ পর্যালোচনা ও যাচাই করে উপযোগীতা নির্ধারণের প্রয়োজন আছে। এছাড়া, পুরনো ভবনগুলোর ক্ষেত্রে ছাদের শক্তি ও টেকসইতা যাচাই না করে সৌরপ্যানেল বসানো ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক বিনিয়োগ ও তার উৎস। যদিও সরকার বলছে, নির্দিষ্ট বরাদ্দ বা সরকারি অনুদানের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, তবে প্রশ্ন উঠছে—এই বিনিয়োগ কি এককালীন, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা থাকবে? সৌর প্যানেল শুধু বসানোই নয়, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্ট ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি সামলানো একেকটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা বলছে—প্যানেল স্থাপন করার ৩-৪ বছরের মধ্যে ব্যাটারি বদলাতে হয়, যা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজের খরচে বহন করতে পারে না।

তবে এই বিনিয়োগের বিপরীতে যে সাশ্রয় পাওয়া যাবে, তা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এক একটি বিদ্যালয়ে বা হাসপাতালের দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ হাজার হাজার টাকায় পৌঁছায়। সৌর শক্তির মাধ্যমে অন্তত দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা গেলে তা জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমাবে এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যয়েও স্বস্তি আনবে।

তৃতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। সৌর প্যানেল বসানো যেমন প্রযুক্তি-নির্ভর, তেমনি এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে এখনো বিশেষজ্ঞ জনবল সীমিত। এই অবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত হবে, তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা জরুরি। সরকার যদি এই বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে এই খাত একটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বের অনেক সরকারি প্রকল্পে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে গাফিলতি বা অনীহা দেখা দেয়। অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ ব্যয় হয়ে গেলেও প্রকৃত কাজ শেষ হয় না, অথবা ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জাম বসিয়ে দায় সারা হয়। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি ইতিবাচক সম্ভাবনার দিক হলো—এই প্রকল্প দেশের শিক্ষার্থীদের নবায়নযোগ্য শক্তি বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সহায়তা করবে। স্কুল বা কলেজে সৌর প্যানেল বসলে শিক্ষার্থীরা তা দেখতে পাবে, জানবে, এমনকি ছোটখাটো পর্যবেক্ষণ বা গবেষণায় অংশ নিতে পারবে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা গড়ে উঠবে।

পরিশেষে, এই উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় হলেও, এটি সফল করতে হলে প্রয়োজন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, আন্তরিকতা, এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো। সরকারি ঘোষণা যদি শুধু নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাস্তবতা বদলাবে না। এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতার উপর।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার কেবল ভবিষ্যতের জন্য নয়, বর্তমানের জন্যও জরুরি। সৌরশক্তিকে ছাদে তুলে আনা মানে কেবল একটি প্রযুক্তি ব্যবহার নয়, বরং একটি শক্তিশালী বার্তা—আমরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম (Muhammad Noora Alam) একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ, যিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রিন্ট, অনলাইন এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

scroll to top