আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা শঙ্কা ও গুজব থাকলেও শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হওয়ায় নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের দিন সম্ভাব্য নাশকতার গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘিরে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অনেকে এটিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বলেও উল্লেখ করছেন।
এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর হলেও সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। তবে এবারের নির্বাচন ও গণভোট তুলনামূলকভাবে সংঘাতমুক্ত ছিল বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, “এই নির্বাচনে কাউকে ভয় দেখানো হয়নি, জালভোট বা আগাম ভোটের অভিযোগও পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় পর ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন।”
১৯৯১ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত অধিকাংশ নির্বাচনেই সহিংসতার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল অংশ না নিলেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৬ জন নিহত হন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ৬৭ জন প্রাণ হারান।
২০১৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সে সময় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া ও ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সারা দেশে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। খুলনায় কেন্দ্রের বাইরে ধাক্কাধাক্কিতে একজন রাজনৈতিক নেতা নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কয়েকজন অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ভোটের দিন কেন্দ্র ও আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ছিল। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবস্থা নেয়। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল একটি কেন্দ্র দখলের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এতে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। নির্বাচনে সংঘাতমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় জাতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ভোটারদের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
একই সঙ্গে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হওয়ায় ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) রেজাউল করিম বলেন, “এবারের নির্বাচনে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মনিটর করা হয়েছে।”
ড. তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলেন, এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন, বিচারিক ক্ষমতা ও সদস্যসংখ্যায় নতুনত্ব ছিল, যা পেশাদারত্বের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক জোটগুলোও সহিংসতা এড়িয়ে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। ফলে দীর্ঘ সময় পর একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে দেশ।