অবাধ লুটপাটে পাথররাজ্য এখন ধুধু বালুর মাঠ

pathor-4-2508120724.jpg
মো: আল মামুন বিশেষ প্রতিনিধি

সিলেটের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘সাদা পাথর’ এখন ধুধু বালুর মাঠে পরিণত হয়েছে। এক বছর আগেও যেখানে ছিল পাথরের স্তূপ, সেখানে এখন খোঁড়া মাটি আর ফাঁকা মাঠ। প্রতিদিন প্রকাশ্যে লুট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার পাথর। প্রশাসন থেকেও নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ।

জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকেই শুরু হয় এই লুটপাট। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ, বিজিবি সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদদেই চলছে এই চক্রের কার্যক্রম। বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাথর লুট হয়েছে।

১৯৬৪ সালে প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প এখন ধ্বংসের মুখে। এক সময়ের ব-দ্বীপসদৃশ পাথরভরপুর ধলাই নদী এখন প্রায় খালি। রোপওয়ের ১০০ একর এলাকাজুড়ে থাকা স্থাপনাগুলোও অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে।

২০১৭ সালে সাদা পাথর পরিচিতি পায় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। পাহাড়ি ঢলে ধলাই নদীর তীরে সৃষ্ট পাথরের স্তূপ পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু এখন সেই জায়গাতেই চলছে প্রকাশ্য লুটপাট। কোদাল, শাবল আর বারকি নৌকায় হাজার হাজার শ্রমিক দিনরাত পাথর তুলে বিক্রি করছে স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি ও যুবদলের নেতারা এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিটি নৌকা পাথরের বিপরীতে দিতে হচ্ছে নির্ধারিত চাঁদা। যারাই সিন্ডিকেটের বাইরে পাথর তুলছেন, তাদের পাথর কেউ কিনছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, “প্রশাসন কোনোদিনই সাদা পাথর রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের উদাসীনতাই আজকের এই অবস্থা ডেকে এনেছে।”

পরিবেশ সংগঠন ‘ভূমি সন্তান বাংলাদেশ’-এর সংগঠক শুয়াইবুল ইসলাম বলেন, “এটা প্রকৃতির লুট। প্রশাসন চাইলে থামাতে পারত। না চাইলে যত কথাই বলি, কোনো লাভ হবে না।”

এদিকে, কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও আজিজুন্নাহার জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে ডিসি অফিসে। এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে অভিযান হতে পারে বলে জানান তিনি।

ওসি উজায়ের মাহমুদ বলেন, “পুলিশ একা এসব বন্ধ করতে পারে না। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স অভিযান করে, সেখানে আমরা সহযোগিতা করি।”

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ‘সাদা পাথর’ এলাকা ইসিএ (পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকা) হিসেবে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় তারা সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবে, চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়।”

সিলেটের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনার এই স্থানটিতে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে যা চলছে, তা বন্ধ না হলে অচিরেই সাদা পাথর শুধু নামেই থাকবে—স্থানে নয়।

Leave a Reply

scroll to top