দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল তখনও। হুইসেল বাজেনি, কিন্তু বাতাসে বিদায়ের গন্ধ স্পষ্ট। আমার হাতে একটা কাগজের কাপ। চায়ের গন্ধটা যেন ইচ্ছা করেই জোরে ছড়াচ্ছিল, ঠিক যেমন কিছু মুহূর্ত চাইলেও থামানো যায় না।
সে বলল, “চোখে চোখ রেখো না, পারব না।”
আমি তাকিয়েই রইলাম।
তার চোখের ভেতর কিছু একটা কাঁপছিল। হয়তো আবেগ, কিংবা না বলা কোনো প্রশ্ন। আমি কিছু বলিনি। এটাই শেষ দেখা—জানি, আমরা দুজনেই জানতাম।
ট্রেন চলা শুরু করল হঠাৎ। শব্দটা বুকের মধ্যে গুঁড়ি মেরে থাকা অস্থিরতাকে টেনে তুলল। সে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এক হাত তুলে কিছু বলতে চাইল বোধহয়, কিন্তু কিছুই বলল না। কেবল চোখ।
চোখের ভাষা বড়ো ভারী হয়—বিশেষ করে শেষ বিকেলের আলোয়।
ট্রেন চলে গেল। শব্দ রইল কিছুক্ষণ। ধোঁয়ার গন্ধ, ইঞ্জিনের কাঁপুনি—সব মিলিয়ে মাথার ভেতরটা ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেল। প্ল্যাটফর্মটা যেন হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেল।
খালি।
নিঃসঙ্গ।
আমি একা বসে রইলাম সেই বেঞ্চে। যেখানে আমরা মিনিট পনেরো আগেও পাশাপাশি বসে ছিলাম। আমাদের কথার ফাঁকে কাগজে মোড়ানো চানাচুর ছিল, এক কাপ চা ছিল। কিন্তু এখন, কাগজটা উড়ে গেছে। আর চায়ের কাপ ঠান্ডা।
এই বিকেলটা আমি রেখে এসেছি ওখানেই।
অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, বহু ট্রেন এসেছে-গেছে, স্টেশনের বিজ্ঞাপন বদলেছে, কিন্তু আমার সেই বিকেল ঠিক ওখানেই পড়ে আছে।
আমার শহরের কোনো রাস্তায় নেই এই বিকেল। নেই অফিসের ডেস্কে, নেই মোবাইলের ফোল্ডারে।
এটা রয়ে গেছে ওই নির্দিষ্ট রেলস্টেশনের এক কোণে, কংক্রিট বেঞ্চের পাশে, একটু থমকে থাকা বাতাসে।
প্রতিবার ট্রেনের হুইসেল শুনলে এখনও বুক ধকধক করে ওঠে।
প্রতিবার স্টেশনের পাশ দিয়ে গেলে আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি—হয়তো সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে জানালার ধারে, হয়তো কিছু একটা বলবে এবার।
কিন্তু জানি, আর বলবে না।
আমরা কেউই বলব না।
আমরা আমাদের সেই বিকেলটাকে ফেলে এসেছি—চিরতরে।





