নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপদেষ্টাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উপদেষ্টারা গোপনীয়তার শপথ নেন না—এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, তারা মন্ত্রিসভার বৈঠকে থাকতে পারেন কি না।
শপথের পরদিন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এটি আনুষ্ঠানিক কেবিনেট মিটিং ছিল না; সৌজন্য বৈঠক ছিল, যেখানে মন্ত্রীদের পাশাপাশি উপদেষ্টারাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের স্বচ্ছ ও কার্যকর সরকার পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। সামনে রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও যাতায়াতসংক্রান্ত সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া ১৮০ দিনের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত জনসমক্ষে উপস্থাপনের কথাও বলা হয়েছে।
সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ হয়। ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও পূর্ণমন্ত্রীরাই মন্ত্রিসভার কেন্দ্রবিন্দু।
সরকারের কার্যবিধিমালা, ১৯৯৬ অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা—অর্থাৎ পূর্ণমন্ত্রীরাই—বৈঠকের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। কোনো মন্ত্রী অনুপস্থিত থাকলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিতে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী অংশ নিতে পারেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বৈঠকে উপস্থিত থেকে কার্যবিবরণী প্রস্তুত করেন। আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সচিবরা বিষয়ভিত্তিকভাবে অংশ নিতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিতে অন্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকতে পারেন।
উপদেষ্টাদের বিষয়ে কার্যবিধির বিধি ৩ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিতে পারেন। বিধি ২১(৪বি)-তে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী চাইলে কোনো উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীকে মন্ত্রিসভা বা এর কোনো কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিতে পারেন। অর্থাৎ আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় উপদেষ্টাদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেবিনেটের নিয়মিত সদস্য হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রীরা। তবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে উপদেষ্টা বা নির্দিষ্ট প্রতিমন্ত্রী বৈঠকে থাকতে পারেন। তিনি জানান, অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত থাকেন, যদিও এটি স্বয়ংক্রিয় সদস্যপদ নয়; বরং প্রথাগত চর্চা। সচিব পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব এবং আইনবিষয়ক সচিব সাধারণত থাকেন, কারণ অধিকাংশ সিদ্ধান্তেই আর্থিক ও আইনি দিক জড়িত থাকে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বিষয়টি লিখিত বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি প্রথানির্ভর। তার মতে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা সাধারণত মন্ত্রিসভা বৈঠকে থাকতেন না। ২০০৯ সাল থেকে এ চর্চায় পরিবর্তন আসে এবং উপদেষ্টাদের উপস্থিতি দেখা যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সংবিধান ও কার্যবিধিতে উপদেষ্টাদের স্বয়ংক্রিয় সদস্যপদের কথা নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তারা বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। ফলে বিষয়টি মূলত প্রথা ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।