সড়কের গাইডওয়াল নির্মাণে কলাগাছের ওপর ইটের গাঁথুনি!

1771670844-62bf1edb36141f114521ec4bb4175579.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক জেলা প্রতিনিধি

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অধীনে নির্মাণাধীন একটি সড়কের গাইডওয়াল নির্মাণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শক্ত মাটি বা কংক্রিটের ভিত্তি নির্মাণ না করে কলাগাছ রেখে তার ওপর ইটের গাঁথুনি দেওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের নজরে এসেছে।

অভিযোগটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার শিরুয়াইল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাকইর চৌরাস্তা মোড়ে।

শিবচর উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিরুয়াইল ইউনিয়নের সাদেকাবাদ হয়ে সিপাইকান্দি থেকে মুন্সীকান্দি গ্রাম পর্যন্ত সড়কের গাইডওয়াল নির্মাণকাজ প্রায় ছয় মাস আগে শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই কাজের ধীরগতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু নিম্নমানের ইট বা বালু নয়, ভিত্তি নির্মাণেও চরম অনিয়ম করা হয়েছে। মাটির ওপর কলাগাছ রেখে তার ওপর ইটের গাঁথুনি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, চরকাকইর এলাকার একটি মসজিদের সামনে নির্মাণাধীন গাইডওয়ালের ইটের গাঁথুনির নিচে কয়েকটি স্থানে আস্ত কলাগাছ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও গাছের অংশ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। যা েোন মতে রাখা হয়েছে।

প্রকৌশল মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের গাইডওয়াল নির্মাণে দৃঢ় ভিত্তি, যথাযথ মাটি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় কংক্রিট বেস থাকা বাধ্যতামূলক। সেখানে কলাগাছের মতো নরম ও পচনশীল উপাদান ব্যবহার কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, “এই সড়কটি আমাদের এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। গাইডওয়ালের নিচে কলাগাছ ব্যবহার করার ঘটনা শুধু অনিয়ম নয়, এটি জননিরাপত্তার সঙ্গে প্রতারণা।”

তিনি নির্মাণকাজের অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কাজের মান নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল। এখন তা চোখে দেখা প্রমাণে রূপ নিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আলমগীর জমাদ্দার বলেন, বিষয়টি তাকে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি। তবে যে রাজমিস্ত্রি কাজটি করেছেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, “আমি এ ধরনের কোনো নির্দেশ দিইনি। ব্যবহৃত মালামাল গুণগত মানসম্পন্ন। কলাগাছ ব্যবহার হয়ে থাকলে তা সরিয়ে সঠিক নিয়মে কাজ সম্পন্ন করা হবে।”

শিবচর উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী জামাল শিকদার বলেন, নির্বাচনের পর অফিস খোলার পর ওই স্থানে আর যাওয়া হয়নি। গাইডওয়াল নির্মাণের বিষয়েও তদারকি করা হয়নি। এ সুযোগে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন।

তিনি জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কলাগাছ অপসারণ করে নতুন করে কাজ করানো হবে।

উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) রেজাউল করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এলজিইডি) বাদল চন্দ্র কীর্তনীয়া বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সরকারি কাজে এমন গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, “গাইডওয়ালের ইটের গাঁথুনির নিচে কলাগাছ ব্যবহার করা অগ্রহণযোগ্য। উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

প্রশ্নে তদারকি ব্যবস্থা

ঘটনাটি এলজিইডির তদারকি ব্যবস্থা ও নির্মাণকাজের মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু কলাগাছ সরিয়ে কাজ করলেই হবে না—পুরো প্রকল্পের মান যাচাই করে প্রয়োজন হলে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের গাইডওয়ালে এমন অনিয়ম জনস্বার্থের পরিপন্থী বলেই মনে করছেন সচেতন মহল। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Leave a Reply

scroll to top