১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক সাময়িকী Time Magazine-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ৩০০ আসনের মধ্যে দলটি ২০৯ আসনে জয় পেয়েছে বলে বেসরকারি ফলাফলে জানা গেছে। এতে দুই দশক পর সরকার গঠনের পথে দলটি।
আইনের শাসন ও জাতীয় ঐক্যের অগ্রাধিকার
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জানান, তার সরকারের প্রথম লক্ষ্য হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন দূর না হলে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিখোঁজের অভিযোগে সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরাময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যে প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সহনশীলতা ও ঐক্যের বার্তা উঠে এসেছে। এর প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উল্লেখ করেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
অর্থনৈতিক সংস্কারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং যুব বেকারত্ব দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
তিনি ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ এবং প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি নারীদের আর্থিক সহায়তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতিতেও নতুন ভারসাম্য আনতে চান তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর-এর সঙ্গে তার বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
ইসলামপন্থী রাজনীতি ও ভারসাম্য
নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তারেক রহমান জানিয়েছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে চান তিনি। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান-এর দলীয় অবস্থান নিয়েও দেশে নানা আলোচনা রয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব এখনও দেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব আবারও দৃশ্যমান হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের স্মৃতিকে সম্মান জানানো তার সরকারের দায়িত্ব। তিনি রাজনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সরকার কতটা সফল হয়।