রাজধানীতে মাঝেমধ্যেই ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড বা ভবন হেলে পড়ার মতো দুর্ঘটনার খবর শিরোনাম হয়। দুর্ঘটনা ঘটলেই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে, নেওয়া হয় নানা সিদ্ধান্ত। তবে সময় গড়ালে সেই উদ্যোগ থেমে যায়, বাস্তবায়ন আর হয় না।
ঢাকায় ঠিক কতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ— তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, শহরের ৭৪ শতাংশ ভবন নকশাবহির্ভূতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে রাজধানী এক প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, ঢাকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩টি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে বিপণিবিতানগুলোও রয়েছে— ৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৯টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৪ সালে সারাদেশে ১ হাজার ১৮১টি বহুতল ভবন পরিদর্শনে ৩৬৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৭৪টি অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা হয়। সুপারিশ দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনও ঝুঁকির বাইরে নয়। গত বছর আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩০টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হয়। এগুলোর সামনে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ভবন এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। কবি নজরুল কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরান ঢাকার কয়েকটি ভবন তার উদাহরণ।
বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, অনেক সময় সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানে টাকার বিনিময়ে ভবন রক্ষা পায়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আরও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘‘বছরের পর বছর ব্যানার ঝুলছে, কিন্তু ভবন অপসারণ হচ্ছে না। কোনোদিন ধসে পড়লে বহু প্রাণহানি ঘটতে পারে।’’
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন ভাঙার ক্ষমতা তাদের নেই, এটি রাজউকের দায়িত্ব। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (অ.দা.) হাছিবা খান বলেন, ‘‘আমরা কেবল সতর্ক করি। কিন্তু ভবন ভাঙার এখতিয়ার রাজউকের।’’
পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজউক ও সিটি করপোরেশন দায় এড়িয়ে চলছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘‘রাজউক প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো কাজ করেনি। এতে ঢাকা ধীরে ধীরে বাসযোগ্যহীন শহরে পরিণত হচ্ছে।’’
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানদের সময়েও কেবল আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ ঝুলে থেকেছে, ভবন ভাঙা হয়নি। বর্তমান চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম অবশ্য দাবি করছেন, ‘‘এবার আর আশ্বাস নয়, কাজেই প্রমাণ পাবেন। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।’’
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন— সেই ‘দ্রুত ব্যবস্থা’ কবে বাস্তবায়ন হবে? এর উত্তরই আজ সবচেয়ে জরুরি।





