তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রিভিউ শুনানি দ্রুত করতে সব রাজনৈতিক দলের আবেদন

HC.jpg
মো: আল মামুন নিজস্ব প্রতিবেদক

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রিভিউ শুনানির দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে দেশের সব রাজনৈতিক দল আবেদন জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। এই বিষয়ে আগামী ২৬ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চে আইনজীবী শিশির মনির শুনানির দ্রুততার আবেদন জানান। তিনি আদালতে বলেন, “সামনে বড় ছুটি রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে সমাধান অত্যন্ত জরুরি—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রিভিউ শুনানি এখনো শেষ হয়নি। তালিকায় এলেও এখনো শুনানি হয়নি।”

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, তবে শুনানি শেষ করতে পারব কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।” জবাবে শিশির মনির বলেন, “মাই লর্ড, অন্তত তারিখ নির্ধারণ করলেই কিছুটা সমাধান হবে।” পরে আদালত ২৬ আগস্ট শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। ২০১১ সালের ১০ মে, আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী, অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে এই সিদ্ধান্ত দেন আদালত।

এই রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে প্রথম আবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনের পক্ষ থেকেও রিভিউ আবেদন জমা পড়ে। তাদের মধ্যে আছেন: সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, বিশিষ্ট নাগরিক তোফায়েল আহমেদ, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া, জাহরা রহমান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন। মোফাজ্জল হোসেন দুটি রিভিউ আবেদন করেছেন—একটি ত্রয়োদশ সংশোধনী, অপরটি পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে। বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় এসব পাঁচটি রিভিউ আবেদন ১৭ নম্বরে উঠেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজন করা হয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
২০০৪ সালের ৪ আগস্ট চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট এই ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে। তবে ২০১১ সালে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়।

এরপর অনুষ্ঠিত হয়: ২০১৪ সালের নির্বাচন (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিযোগ), ২০১৮ সালের নির্বাচন (রাতের ভোট বিতর্ক), ২০২৪ সালের নির্বাচন (ডামি নির্বাচন ও অংশগ্রহণহীনতা)। তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকায় এই তিনটি জাতীয় নির্বাচনই ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকের মতে, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর, এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার আবহ তৈরি হয়েছে। সব রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ঐকমত্যের চেষ্টা চলছে।

রিভিউ শুনানির পর আপিল বিভাগ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে মত দেয়, তাহলে তা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, পুনর্বহাল না হলে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন চালিয়ে যেতে হবে, যা আরও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

Leave a Reply

scroll to top