খামেনির পতন হলে পরবর্তী নেতৃত্বে আসছেন কে?

New-Project-16-4.jpg

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ

ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা বহুদিন ধরেই ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে হটাতে চায়। সাম্প্রতিক হামলা ও বক্তব্য বিশ্লেষকরা বলছেন—এই প্রচেষ্টা এখন আর কেবল পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরাসরি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটনের দিকে এগোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান সরকারের পতন হলে দেশটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত, অস্থিতিশীল ও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসরায়েল এখন শুধু ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় নয়, বরং তেহরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মতো প্রতীকী কেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে। অনেকেই এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান বলেই দেখছেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেন, “আমরা জানি খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন।”

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সত্যি যদি দীর্ঘ সময়ের এই শাসক পদচ্যুত হন, তাহলে ইরানে কী ঘটবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ২০০৩ সালে ইরাক এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের পর যে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা এখনো পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সম্প্রতি জি-৭ সম্মেলনে বলেন, “আজকের সবচেয়ে বড় ভুল হবে সামরিকভাবে ইরানে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করা। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি ইরাক ও লিবিয়ায় কী হয়েছে।”

নেতৃত্বহীন বিরোধী পক্ষ

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বিরোধী পক্ষগুলো একত্র নয় এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী রেজা পাহলভী—ইরানের শেষ শাহর পুত্র—সবচেয়ে পরিচিত নাম হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা বিতর্কিত। তিনি ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন, এমনকি সাম্প্রতিক হামলার কোনো নিন্দাও করেননি, যা তাকে আরও বিতর্কিত করেছে।

অন্যদিকে, ‘পিপলস মুজাহিদিন অব ইরান’ নামের আরেকটি বিরোধী দল দাবি করছে, ইরানি জনগণ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন চায়। তবে এই দলটির অতীত—বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পক্ষে অবস্থান—তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস জুনো বলেন, “যদি ইসলামি শাসন পতন হয়, তাহলে সেখানে গণতান্ত্রিক বিকল্প নেই বললেই চলে। আইআরজিসি বা সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে, যা আরও বেশি কট্টর ও দমনমূলক হতে পারে।”

জাতিগত বিভাজনের ভয়

ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও একটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে দেশটির জাতিগত বৈচিত্র্য। পারস্য জনগোষ্ঠীর বাইরে দেশটিতে রয়েছে কুর্দি, আরব, বেলুচ এবং আজারবাইজানি তুর্কিসহ নানা সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতনের পর এই জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বা বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিতে পারে, যেটিকে বিদেশি শত্রু রাষ্ট্রগুলো কাজে লাগাতে পারে।

কারনেগি এনডাওমেন্টের গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, “যদি শাসনের পতন ঘটে, আশা থাকবে একটি উদার সরকার আসবে। তবে বাস্তবে আরও কট্টরপন্থী, সামরিক ভিত্তিক শক্তির উঠে আসার সম্ভাবনাই বেশি।”

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক সৌফান সেন্টার বলছে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অনেকের কাছে ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, একে সরানো মানে ‘ইরাক ২.০’ নামক ভয়ঙ্কর এক পুনরাবৃত্তি। এ অবস্থায় সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সংলাপই ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।

ইরানকে নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির টানাপোড়েন এখন শীর্ষে। ধর্মীয় শাসনের পতনের সম্ভাবনা যেমন একদিকে অনেককে আশাবাদী করছে, তেমনি অন্যদিকে এই পরিবর্তন যদি প্রস্তুতিহীন ও সহিংস হয়, তাহলে সেটি শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতির জন্য নতুন এক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।

তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, সৌফান সেন্টার, কারনেগি এনডাওমেন্ট

Leave a Reply

scroll to top