হাসিনাও শাসনের পতনের পর দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গঠনে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, বাস্তবে তার চেয়ে ঘাটতিই বেশি—এমন মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই সময়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর ভিত্তি ছিল দুর্বল, অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট এবং কোথাও কোথাও উল্টো পথে যাত্রার নজিরও দেখা গেছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম ও মো. জুলকারনাইন।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিচার, সংস্কার, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একটি প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে এই অবকাঠামো পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—তিন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি যতটা মজবুত হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই সনদের আওতায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য অর্জন একটি ইতিবাচক দিক হলেও, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য বিধানগুলোতে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের প্রতিরোধের কারণে সংস্কারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অধ্যাদেশ ও সরকারি সিদ্ধান্তে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশের অন্তর্ঘাতমূলক ভূমিকার কাছে সরকারের নতি স্বীকার সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রণীত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশেই জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারের নামে উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে অপসারণ করা হলেও বাস্তবে আমলাতন্ত্রে একচেটিয়া প্রভাব দূর হয়নি। বরং পতিত সরকারের সুবিধাভোগী অংশ এবং বর্তমানে সক্রিয় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রভাব কাঠামো গড়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক ও ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ প্রবণতা স্পষ্ট। একদিকে সিদ্ধান্তহীনতা, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তার অভাব সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাও বেড়েছে।
বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে কিছু প্রশংসনীয় অগ্রগতি হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি, প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা এবং বিচার ও প্রতিশোধের একাকার হয়ে যাওয়ার প্রবণতা গভীর উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। এতে একদিকে অভিযুক্তদের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনাও কমছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে টিআইবি “গভীর হতাশাব্যঞ্জক” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির মতে, গণমাধ্যম এখন শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের নয়, অতিক্ষমতায়িত অরাষ্ট্রীয় শক্তির চাপের মুখেও পড়েছে, যা প্রতিহত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি নারী অধিকার, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতেও সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে টিআইবির মূল্যায়নে উঠে এসেছে, নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গঠনের যে আশা তৈরি হয়েছিল, দেড় বছরে তার বাস্তব প্রতিফলন খুবই সীমিত। সংস্কারের ক্ষেত্রে অর্জনের চেয়ে ঘাটতির পাল্লাই ভারী, যা ভবিষ্যতে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।





