বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতন, একাধিক মামলা, দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে তিনি আবারও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় নেতৃত্ব, কৌশল নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তার ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
তারেক রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং শুরু থেকেই বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সেসব নির্বাচনী কার্যক্রমের সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর মাধ্যমে দলীয় রাজনীতিতে তার কার্যকর উপস্থিতি শুরু হয়।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারেক রহমান বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ২২ জুন দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
তবে ২০০০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার রাজনৈতিক ভূমিকা মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। মাঠপর্যায়ের রাজনীতির তুলনায় দলীয় কার্যালয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সম্পৃক্ততা বেশি আলোচিত ছিল। ওই সময় হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগসহ নানা বিতর্ক তাকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সময়ের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, বিদেশে অবস্থান, একাধিক মামলা এবং রাজনৈতিক চাপ তার রাজনৈতিক চিন্তা ও কৌশলে পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে। প্রায় ১৮ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তিনি নতুনভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন।
দেশে ফেরার পর আয়োজিত গণসমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সমন্বিত নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা করাই তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে যেকোনো উসকানির মুখে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন বিভাগে জনসভা ও সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশা তুলে ধরা এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি নতুন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা এখন তার প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন, দলীয় কার্যক্রম গতিশীল করা এবং শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন।
বাংলানিউজ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, অনেকেই অতীত ও বর্তমানের তারেক রহমানের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করছেন। কেউ তাকে বেশি পরিণত ও সংযত নেতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন তার অতীত বিতর্ক পুরোপুরি মুছে যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের সার্বিক দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর আসায় বিএনপির নেতৃত্বে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রার্থী মনোনয়নে মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বাস্তব তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ায় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে বলেও তিনি মনে করেন।
আরেক বিশ্লেষক খালিদ হোসেন বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অবস্থানে প্রতিফলিত হয়েছে। আগে তাকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে তিনি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মতে, তারেক রহমান এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে তিনি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের সমর্থনের ওপর।





