জাতীয় নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপে ব্যস্ত, তখন দৃশ্যমান হচ্ছে গভীর মতবিরোধ ও আস্থার সংকট—বিশেষ করে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোগত সংস্কার ঘিরে।
প্রথমদৃষ্টিতে আলোচনার অগ্রগতি কিছুটা হলেও আশাব্যঞ্জক। লন্ডনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটি অনেকটাই নিরসন হয়েছে। তবে একইসঙ্গে উত্থিত হয়েছে আরও স্পর্শকাতর ও জটিল প্রশ্ন:
কে কবে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন?
দল ও সরকারপ্রধান এক ব্যক্তি হওয়া যাবে কি না?
সংবিধান সংস্কার হবে, না নতুন সংবিধান তৈরি হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য ধরা পড়ে।
তিন পক্ষ, তিন অবস্থান
মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—এই তিনটি দলই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সক্রিয়। কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়নের সময় ও মাত্রা নিয়ে তাদের অবস্থান ভিন্ন।
বিএনপি চাইছে, নির্বাচনের আগে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য আসবে, কেবল সেগুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হোক। বাকি বিষয়ের মীমাংসা নির্বাচনের পর গণরায়ের ভিত্তিতে করা যাবে।
জামায়াত ও এনসিপি বলছে, নির্বাচনের আগেই মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়তো নির্বাচনের পর সেগুলো ঝুলে থাকবে।
এনসিপি আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছে—ঘষামাজা সংস্কার নয়, বরং একটি নতুন সংবিধান দরকার।
বিএনপি যেখানে ক্ষমতায় আসার পথ উন্মুক্ত রাখতে চায়—গ্যাপ দিয়ে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগের পক্ষে—সেখানে জামায়াত স্পষ্টভাবে বলছে, দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় থাকলে কর্তৃত্ববাদ ফেরার ঝুঁকি বাড়ে।
এছাড়া দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধানের পদ একই ব্যক্তির হাতে থাকা নিয়েও রয়েছে দ্বিমত। বিএনপি এতে সমস্যা দেখছে না, জামায়াত ও এনসিপি দেখছে কর্তৃত্ববাদী বিপদের আশঙ্কা।
সংবিধান: সংস্কার নাকি পুনর্গঠন?
সংবিধান নিয়েই যেন সবচেয়ে জটিল বিতর্ক। বিএনপি ও জামায়াত সংশোধনের পক্ষে থাকলেও
এনসিপি বলছে, নতুন সংবিধান ছাড়া মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। অতীতে যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তন বা বাতিল করা হয়েছে, তাতে পুরনো সংবিধানে আস্থা রাখা কঠিন।
জটিলতা নিরসনে জামায়াত প্রস্তাব করেছে গণভোটের—মৌলিক বিতর্কিত ইস্যুগুলো জনগণের রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য। তাদের ভাষায়, “এই ইস্যুগুলো ঝুলিয়ে রাখা যাবে না, জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ সতর্ক করছেন, “সব রাজনৈতিক দল একমত হবে—এমন আশা অবাস্তব। কিন্তু কেউ যদি ছাড় না দেয়, তাহলে জাতীয় ঐক্য বাস্তবে পরিণত হবে না।”
বর্তমানে কমিশন ১৬৬টি ইস্যুতে আলোচনায় বসছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয়ের বিভক্তি এখনও ঐকমত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই ঐকমত্য বাস্তবায়নযোগ্য কি না? রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, ক্ষমতা ছাড়ার মানসিকতা, এবং জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান—সবই নির্ধারণ করবে এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ।
যদি ঐকমত্য কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, কিংবা অংশীজনরা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পর নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়—তাহলে দেশে আবারও গভীর সংকট ঘনীভূত হবে।
জাতীয় ঐকমত্যের উদ্যোগ যতটা সম্ভাবনাময়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ‘ঐকমত্য’ গঠনের পাশাপাশি, সেটিকে বাস্তবায়নের বাস্তবতা ও সময়সীমার মধ্যে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ।





