রংপুরের গংগাচড়া এলাকায় সম্প্রতি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু ঘটনার প্রায় তিন দিন পরও আতঙ্ক কাটেনি—অনেক পরিবার এখনও নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই রাতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার আগে মাইকিংয়ের মাধ্যমে লোকজন জড়ো করা হয়। পুলিশের ও প্রশাসনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলাকারীদের মধ্যে অনেকেই ‘বহিরাগত’ ছিলেন। কিশোরগঞ্জের নীলফামারী জেলা থেকে বেশ কয়েকজন এসে হামলা চালিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিলেন। হামলায় মোট ২২টি বাড়ি লুটপাট ও ভেঙে ফেলা হয়।
২৯ জুলাই মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প বসানো হয়েছে এবং পুলিশ টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ঢেউটিন, কাঠ, চাল-ডাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছে এবং ঘরবাড়ি মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে। তবুও এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক কাটেনি।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের এক সদস্য অশ্বিনী চন্দ্র মোহান্ত বলেন, “সেদিনের ঘটনা ছিল এক ভয়াবহ ট্রমা। আমরা নিজে থেকেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কিশোরটিকে থানায় দিয়েছি, কিন্তু তারপরও আমাদের বাড়ি রক্ষা হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বিরা আমাদের আশ্বাস দিলেও কোনও সাহায্য হয়নি।”
অশ্বিনী আরও জানান, “আমরা ওই কিশোরটিকে থানায় সোপর্দ করেছিলাম, কিন্তু হামলাকারীরা মিছিল নিয়ে এসে দুই দফায় প্রায় ২০-২৫টি বাড়ি ভেঙে দিয়েছে এবং লুটপাট করেছে। অধিকাংশ হামলাকারী আমাদের কাছে অপরিচিত।”
অন্য ক্ষতিগ্রস্ত দেবেন্দ্র চন্দ্র বর্মন বলেন, “প্রথমে কম বয়সী কয়েকজন আসে, কিন্তু পরে হাজার হাজার লোক এসে আমাদের বাড়িঘরে তাণ্ডব চালায়। এখন অনেকেই আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, সবাই আতঙ্কিত।”
রবীন্দ্র চন্দ্রের স্ত্রী রুহিলা রানী বলেন, “আমাদের ছোট ছেলেটি যদি কোনো ভুল করে থাকে, আমরা তাকে থানায় দিয়েছি। কিন্তু তারপরেও এত ভাঙচুর কেন? আমাদের গরু, সোনা-টাকা সব লুটে নিয়েছে। শুধু চাল-ডাল আর টিন দিয়ে জীবন চলে না।”
গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গংগাচড়া থানার অফিসার ইনচার্জ আল এমরান জানান, “হামলার খবর পেয়ে অভিযুক্ত কিশোরটিকে গ্রেপ্তার করে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও প্রশাসন সর্বাত্মক নিরাপত্তা বজায় রেখেছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদ হাসান মৃধা বলেন, “অপরাধীদের ধরতে সকল ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে।”
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের তথ্যমতে, হামলায় মোট ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ২২টি পরিবার বসবাস করতেন। মেরামত কাজ শেষে কিছু পরিবার ফিরে এসেছে, তবে অভিযুক্ত কিশোর ও তার পরিবারের কেউ এখনো এলাকায় ফিরে আসেনি।