গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন: বাংলাদেশি ধনকুবেরদের যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর

The-Guardian-logo.jpg
মো: আল মামুন নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের মুখে থাকা বাংলাদেশি ধনকুবেররা যুক্তরাজ্যে সম্পত্তির মালিকানা বিক্রি, হস্তান্তর বা পুনঃঅর্থায়ন করছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। গত শনিবার (১৯ জুলাই) গার্ডিয়ান এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ঢাকায় তদন্তাধীন ব্যক্তিরা যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি লেনদেনে সক্রিয় হয়েছেন। এসব লেনদেনে যুক্তরাজ্যের আইনি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ তারা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যবসা ও লেনদেন সহজতর করেছে।

যুক্তরাজ্যের ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তদন্তাধীন ব্যক্তিদের মালিকানাধীন সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ২০টি লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে, যা বিক্রি, হস্তান্তর বা বন্ধকের ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে চারটি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তিনটি বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এবং তিনটি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের পরিবারের সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।

গত মে মাসে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) সালমান এফ রহমানের পরিবারের ৯ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে। এর তিন সপ্তাহ পর সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি জব্দ করা হয়, যিনি ভূমিমন্ত্রী থাকাকালীন ৩০০টির বেশি সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেছিলেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাজ্যের কাছে আরও সম্পত্তি জব্দের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমরা সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা সম্পর্কে সচেতন। যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে আরও জব্দের নির্দেশনার অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে সম্পদ ফেরতের প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে এগোয়।” দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনও এনসিএ-কে একই অনুরোধ জানিয়েছেন।

নাইটসব্রিজের একটি চারতলা টাউন হাউস বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের মালিকানাধীন ছিল, যিনি দুদকের তদন্তাধীন। গত এপ্রিলে এটি বিনামূল্যে ব্রুকভিউ হাইটস লিমিটেডে হস্তান্তর করা হয়, যার মালিক অরবিস লন্ডনের একজন পরিচালক। পরে এটি ৭৩ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়। সোবহান পরিবারের আরেক সদস্য সাফিয়াত সোবহানের মালিকানাধীন সারের ৮০ লাখ পাউন্ডের একটি বাড়িসহ আরও দুটি লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে। পরিবারটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান গত জুলাইয়ে রিজেন্টস পার্কের কাছে ১ কোটি পাউন্ডের একটি টাউন হাউস বিক্রি করেছেন। তিনটি সম্পত্তির পুনঃঅর্থায়নের আবেদনও জমা পড়েছে। তাঁর আইনজীবীরা বলেছেন, এই বিক্রি অভ্যুত্থানের আগে নির্ধারিত ছিল এবং জব্দের কোনো বৈধ কারণ নেই।

সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাতিজার তিনটি সম্পত্তি-সংক্রান্ত লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে গ্রসভেনর স্কয়ারের ৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যা এনসিএ জব্দ করেছে। তাঁদের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এসব অভিযোগ উঠছে এবং তারা তদন্তে সহযোগিতা করবেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, আইনি সংস্থাগুলোর তদন্তাধীন গ্রাহকদের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং সম্পদের উৎস যাচাই করে সন্দেহজনক কার্যকলাপ পুলিশকে জানানো দরকার। জাসওয়াল জনস্টন ও মেরালি বিডলের মতো সংস্থাগুলো এসব লেনদেনে জড়িত ছিল, তবে তারা বিক্রির সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেছে বা মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।

যুক্তরাজ্যের এমপি জো পাওয়েল, যিনি দুর্নীতি ও করবিষয়ক সংসদীয় গ্রুপের চেয়ারম্যান, বলেছেন, তদন্ত দ্রুত এগোনো উচিত, নইলে সম্পদ বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি এনসিএর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a Reply

scroll to top