শিরোনাম :
পারমাণবিক আগুনে ঘি ঢালছে মধ্যপ্রাচ্য একটি সমাধি ঘিরে অসংখ্য বিশ্বাসের গল্প সু চির সাজা কমালেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং হরমুজ প্রণালি সচল করতে প্যারিসে বিশ্ব সম্মেলন: ম্যাক্রোঁ-স্টারমারের বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ হজযাত্রীদের পদচারণায় মুখর আশকোনা হজক্যাম্প: রাতে উড়ছে প্রথম ফ্লাইট সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুরু ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলে পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের ছাড় দিল যুক্তরাষ্ট্র নিম্নমানের কিটে ভুল রিপোর্ট, বাড়ছে হেপাটাইটিস-এইচআইভি ছড়ানোর শঙ্কা দেশের তরুণ-তরুণীরা ইন্টারনেটে কী বেশি খোঁজে? চীন সফরে বিএনপির প্রতিনিধিদল, বিমানবন্দরে বিদায়ী সংবর্ধনা

ব্যয়বহুল ক্যানসার চিকিৎসা: বিকল্প অর্থায়নে বাঁচতে পারে বহু প্রাণ

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং মারা যান প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার রোগী। কিন্তু বেশিরভাগ রোগীরই চিকিৎসা নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা থাকে না। ফলে অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। এমন বাস্তবতায় ব্যয়বহুল ক্যানসার চিকিৎসায় অসচ্ছল রোগীদের জন্য বিকল্প অর্থায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্যানসারের মতো জটিল রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে অধিকাংশ পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলে। অনেকেই বাড়িঘর বিক্রি কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য হন। ফলে ক্যানসার চিকিৎসা বহু পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট পরিচালিত আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব ক্যানসার পলিসি-তে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বর ক্যানসারের অর্থনৈতিক বোঝা’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ১২ হাজার ১১৭ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। যা অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বহু গুণ বেশি।

গবেষণায় স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বর ক্যানসারে আক্রান্ত ৩৪৬ জন রোগী ও তাদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ছিল ২০ হাজার টাকার নিচে। আর মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের আয় ছিল ৫০ হাজার টাকার বেশি। রোগীদের মধ্যে ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ বিবাহিত। অধিকাংশ রোগী ঢাকা (৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ), চট্টগ্রাম (২২ শতাংশ) ও রাজশাহী (১৬ দশমিক ২ শতাংশ) বিভাগের বাসিন্দা।

কোন খাতে কত ব্যয়

গবেষণায় দেখা যায়, সরাসরি চিকিৎসা ব্যয়—যেমন চিকিৎসক ফি, ওষুধ ও পরীক্ষা—গড়ে ৪ হাজার ৩৮৭ ডলার, যা মোট ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। নন-মেডিকেল খরচ—যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে থাকা—গড়ে ৪৭২ ডলার। রোগী ও সঙ্গীর আয়হানিসহ পরোক্ষ ব্যয় গড়ে ১ হাজার ৮৭৫ ডলার, যা মোট ব্যয়ের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে অদৃশ্য ব্যয়—মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও সামাজিক ভোগান্তি—যার পরিমাণ গড়ে ৫ হাজার ৩৮৩ ডলার, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, দেশে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা খরচ হয়। এই ব্যয় সর্বনিম্ন ৮১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে।

ক্যানসারের প্রথম স্তরে চিকিৎসা ব্যয় গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। দ্বিতীয় স্তরে তা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। এই ব্যয় মেটাতে প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবার ঋণ নেয়, ৬৫ শতাংশ পরিবার নিয়মিত আয় থেকে খরচ চালায়, ৫৬ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভাঙে এবং ৪০ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ ধরনের ক্যানসারে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৪৫৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন প্রায় ৩১৯ জন।

ডব্লিউএইচওর মতে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশে অন্তত ১৭০টি ক্যানসার সেন্টার থাকা দরকার। বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২২টি, যার বেশিরভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয় বা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপি, সার্জারি, রেডিওথেরাপি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় অত্যন্ত বেশি।

বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে নাগরিকদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমা নেই এবং দাতব্য কার্যক্রমও সীমিত। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দরিদ্র রোগীদের জন্য ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দিলেও তা ক্যানসার চিকিৎসার তুলনায় খুবই সামান্য। তাই সরকারি উদ্যোগে বিকল্প অর্থায়ন চালু করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, প্রথমে ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এরপর চিকিৎসার ব্যয় সরকার, বীমা কোম্পানি কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে বহন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসার চিকিৎসায় কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, যা সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

তিনি বিকল্প অর্থায়নের একটি প্রস্তাব দেন। তার মতে, দেশে প্রায় ২০ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী রয়েছে। প্রত্যেকে প্রতিদিন এক টাকা করে দিলে বছরে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব।

এ ছাড়া তামাকজাত পণ্যের কর ১০ শতাংশ বাড়ালে অতিরিক্ত প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। সরকার যদি আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়, তাহলে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা সম্ভব।

এই তহবিল থেকে ক্যানসারসহ অন্যান্য ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় রোগীদের চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এটিকে জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ সুইট ও বেভারেজ পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে সেই অর্থ তহবিলে যুক্ত করা যেতে পারে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের একটি অংশও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে বছরে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা গেলে ক্যানসারসহ ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD