এলডিসি উত্তরণ পেছানোর চেষ্টায় বাংলাদেশ: কতটা সম্ভব?

df5226e222a12ae9107a47a1cecaa798-6999b7517fc7f.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রফতানি খাতে চাপ এবং বাজেট সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে কিনা—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, সরকারের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে আবেদন কার্যকর করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনও দেশ প্রস্তাবে আপত্তি না জানায়।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কূটনৈতিক ও বাণিজ্য নীতির সমন্বয় ছাড়া এলডিসি উত্তরণের সুফল পুরোপুরি ভোগ করা কঠিন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো বড় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিতে বাজার বহুমুখীকরণের কৌশল নিতে হবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, শুল্কসুবিধা হ্রাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাণিজ্য কূটনীতিকে অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনা জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, দেশের পক্ষ থেকে কার্যত ‘ক্রাইসিস বাটন’ চাপানো হয়েছে।

আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে নিউইয়র্কে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-র পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠক শুরু হবে। সেখানে বাংলাদেশের আবেদন মূল্যায়ন করা হবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ইএমএম উপকমিটির প্রধান ও সিডিপির সদস্য হিসেবে বৈঠকে অংশ নেবেন।

তিনি বলেন, প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী আগের উত্তরণ মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সাম্প্রতিক তথ্য মিলিয়ে বাংলাদেশকে বিচার করা হবে। বিশেষ করে গত নভেম্বরে সরকারের দেওয়া প্রতিবেদনের সঙ্গে নতুন আবেদনের তুলনা করা হবে। উত্তরণকালীন কৌশলপত্র বাস্তবায়নে আন্তরিকতাও পর্যালোচনায় আসবে।

ত্রিবার্ষিক ভিত্তিতে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। প্রধান তিনটি সূচক হলো—

এই তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ফলে ২০২৪ সালে উত্তরণ নিশ্চিত ছিল। তবে করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সই করা চিঠি সিডিপির কাছে পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত প্রস্তুতিমূলক সময় কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। অভ্যন্তরীণভাবে বিনিয়োগ হ্রাস, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কাঠামোগত সংস্কার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সরকার তিন বছরের জন্য একটি ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা এবং সময় বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, ফেব্রুয়ারির বৈঠকের প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। এরপর সিডিপি পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেবে।

চূড়ান্ত সুপারিশ যাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে, যেখানে এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

ব্যবসায়ী মহলের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সময় বৃদ্ধি পাওয়া গেলে রফতানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প—এলডিসি-উত্তর প্রতিযোগিতার জন্য আরও শক্তিশালী প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে।

এখন নজর ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সিডিপি বৈঠকের দিকে। চলমান মূল্যায়নের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণে নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখবে নাকি নতুন সময়সীমা পাবে।

 

Leave a Reply

scroll to top