জাতীয় নির্বাচনে এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ

images.jpeg
মো: আল মামুন এম আলী

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এক কঠোর আচরণবিধি চূড়ান্ত করেছে, যা নির্বাচনি প্রচার, অর্থনৈতিক লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং প্রার্থীদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড—সব ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এই আচরণবিধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সংযোজন হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। এর মাধ্যমে নির্বাচনে প্রযুক্তি অপব্যবহার প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশন এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, দেশের রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই বিধিমালার খসড়া ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য কমিশনের নিয়মিত সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডিজিটাল যুগে সামাজিক মাধ্যমে তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজনীয়।

নতুন আচরণবিধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো প্রার্থী বা দলের পক্ষে কেউ যদি ডিপফেইক ভিডিও, এডিট করা অডিও, বিকৃত মুখাবয়ব, বানোয়াট তথ্য, মিথ্যা খবর বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য প্রচার করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার অপরাধ দমন আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ যা সরাসরি দেশের নির্বাচনি পরিবেশে প্রযুক্তির অনৈতিক ব্যবহার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নির্বাচনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠছে। এটি এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশগুলোতেও ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা চাই গণমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি এবং সাধারণ নাগরিকদের সহযোগিতায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে।”

আচরণবিধির ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনি প্রচারে কোনো ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করা যাবে না। প্রতিপক্ষ প্রার্থী বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক বক্তব্য প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একইভাবে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। প্রার্থীদের ছবি বিকৃত করে প্রচার চালানো যাবে না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্বাচনি দিন ও তার আগপর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট বা পার্টির আয়োজন করে প্রচার চালানো যাবে না। ভোটগ্রহণের দিন যানবাহন ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, এবং কেবলমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তিরাই যানবাহন ব্যবহার করতে পারবেন। এমনকি মোটরসাইকেল চলাচলেও নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

নির্বাচনে আর্থিক লেনদেনের দিক থেকেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দল সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা এবং প্রার্থী সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার বেশি নগদ অর্থ লেনদেন করতে পারবে না। এর বেশি হলে তা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং কালো টাকার প্রভাব রোধ করা যায়।

আচরণবিধিতে এবার একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ধারা যুক্ত করা হয়েছে—প্রার্থীর দলীয় পটভূমি ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক আছে কি না, তা জানাতে হবে। প্রার্থী এবং দল, উভয়ের কাছ থেকেই লিখিত অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করা হবে। ‘তফসিল-১’ এর ‘দলীয় অঙ্গীকারনামা’তে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আমার দলের মনোনীত প্রার্থী কখনোই কোনো নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন রাজনৈতিক দল/সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না বা এখনো নেই।”

সিইসির কাছে এক সাংবাদিক জানতে চান, আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না। উত্তরে সিইসি বলেন, “আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।” তবে তিনি এটিও জানান যে, দলের সমর্থকরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনি প্রচারে প্রিন্ট উপকরণের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পোস্টার, ব্যানার ও লিফলেট—সবকিছুই সাদা-কালো রঙে ছাপাতে হবে। ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, ফেস্টুনের আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং লিফলেট বা হ্যান্ডবিল হবে A4 সাইজের সমান। রঙিন পোস্টার ও চটকদার প্রচার উপকরণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে হেলিকপ্টার ব্যবহার সংক্রান্ত বিধানে। এখন দলীয় প্রধান ছাড়াও দলীয় সাধারণ সম্পাদক শর্তসাপেক্ষে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন। আগে কেবল দলপ্রধানদের এই অনুমতি ছিল।

আচরণবিধির আরেকটি ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর কোনো প্রার্থী তার নির্বাচনি এলাকার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালাতে পারবে না। এমনকি সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও থাকতে পারবে না। যদিও প্রাথমিকভাবে এই বিধান দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য ছিল, বিএনপির সুপারিশে তা সংশোধন করে কেবল নির্বাচনি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

এই সব বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার যে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা প্রযুক্তিনির্ভর যুগে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় নির্বাচনে তথ্য বিকৃতি, চরিত্রহনন এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই নতুন আচরণবিধি ভবিষ্যতের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে বলেও তারা আশাবাদী।

Leave a Reply

scroll to top