অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা হয়। দুর্বল ব্যাংক অবসায়নে জারি করা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েন।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর আপত্তি উপেক্ষা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নতুন সরকার পুনর্বিবেচনা করবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। শেষ পর্যন্ত এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়।
নভেম্বরের ৩০ তারিখ নতুন ব্যাংকটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকা পেইড-আপ ক্যাপিটালের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা এসেছে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে।
তবে সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মূল্য নেগেটিভ নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (এনএভি) ভিত্তিতে শূন্য ঘোষণা করা হয়।
বিএসইসি আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পাঁচটি সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল—
লাইসেন্স, ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, ব্র্যান্ড ভ্যালু, মানবসম্পদসহ অদৃশ্য সম্পদের মূল্যায়ন; জামানত ও দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ থেকে আদায়যোগ্য অর্থ বিবেচনা; দায়ী ব্যক্তিদের শেয়ার বাদ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম স্বার্থমূল্য নির্ধারণ; একীভূতকরণ অনুপাত নির্ধারণে স্বার্থমূল্য স্বার্থমূল্য নির্ধারণ ছাড়া ডিলিস্টিং না করা।
বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, “একটি শেয়ারের বাজারমূল্য কখনও শূন্য হতে পারে না।” তার মতে, দায়ী নন—এমন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তত ফেস ভ্যালু বা বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেইলআউট প্যাকেজে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০০–৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলো না কেন।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এনএভি নেগেটিভ হয়ে যাওয়ায় হিসাব অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উল্টো অর্থ আদায়ের প্রশ্ন উঠতে পারত। “কিন্তু আমরা তো সেটা করছি না,” বলেন তিনি।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছিল এবং কয়েক বছর ধরেই অনিয়ম চলছিল। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম একে “রেগুলেটরি ফেইলর” আখ্যা দিয়ে বলেন, আর্থিক অনিয়ম সময়মতো প্রতিফলিত হয়নি। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “নেট অ্যাসেট ভ্যালু মাইনাস হয়েছে—এতে তো বিনিয়োগকারীর দোষ নেই। উদ্যোক্তাদের শেয়ার বাদ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কিছু মূল্য দেওয়া উচিত।”
এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারধারী মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন বলেন, “শেয়ার কেনা তো অন্যায় নয়। যারা ব্যাংক লুট করেছে, তাদের দায় আমরা কেন নেব?”
ট্রাস্ট ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের একজন বিনিয়োগকারী ফখরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। “আমরা তো কারও টাকা মারিনি। তাহলে আমাদের পুঁজি শূন্য হবে কেন?”—প্রশ্ন তার।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, আইনের মারপ্যাঁচে বিনিয়োগকারীদের অধিকার খর্ব করা যাবে না। তার মতে, পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে সরকারকে বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা করতে হবে।
ঘটনার পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। আমানতকারীদের সুরক্ষায় সরকার বড় অঙ্কের তহবিল দিলেও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ সেল ভ্যালু বিবেচনায় শেয়ার বাজারে লেনদেন হয়; শুধুমাত্র এনএভি দিয়ে নয়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আংশিক ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প সমাধান খুঁজে দেখা উচিত। বিনিয়োগকারীদের দাবি, নতুন সরকার পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।





