শহীদ মিনারের ব্যতিক্রমী ঘটনা কি রাষ্ট্রপতির বিদায়ের বার্তা?

1771673225-9c4fc9f6805b3226fca7dc9dee55cc8f.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

মহান একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ রয়েছে। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আগে উপস্থিত হন, রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান এবং এরপর দুজন একত্রে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

কিন্তু এবার সেই প্রথায় দেখা গেছে দৃশ্যমান ব্যতিক্রম। আর এ ব্যতিক্রম ঘিরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—বর্তমান রাষ্ট্রপতি কি বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

চলতি বছর একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাত ১২টা ১ মিনিটে তিনি শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

এরপর রাত ১২টা ৫ মিনিটে শহীদ মিনারে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ১২টা ৮ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আলাদা সময়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের এ ঘটনা রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি নিছক প্রোটোকলগত পরিবর্তন নয়; বরং একটি প্রতীকী রাজনৈতিক সংকেত।

বিদায়ের জল্পনা কেন?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকার পতনের পরও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদে বহাল থাকেন। সে সময় তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে অপসারণ বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়নি।

সেসময় বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে পদে বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জানান, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান।

এই প্রেক্ষাপটে শহীদ মিনারের ব্যতিক্রমী আয়োজনকে অনেকেই সম্ভাব্য বিদায়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী চাইলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একত্রে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারতেন। তবে তাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারত। তাই রাজনৈতিকভাবে একটি দৃশ্যমান ‘দূরত্ব’ বজায় রাখা হয়েছে।

তাদের ব্যাখ্যা—রাষ্ট্রপতির বিদায় অনিবার্য হলে আগেভাগে প্রতীকী অবস্থান স্পষ্ট করাই কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।

নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাও দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন কবে এবং কীভাবে।

সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বোচ্চ দুইবার এ পদে থাকতে পারেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।

তবে সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ, পদত্যাগ অথবা অভিশংসন—এই তিন উপায়ে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে। রাষ্ট্রপতি যদি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হয় না। অন্যথায় সংসদ সদস্যদের ভোটে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ সম্ভব।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষের কারণে পদ শূন্য হলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। তবে পদত্যাগ বা অভিশংসনের ক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন পরিচালনা করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক রীতি মেনে চলাই উচিত। তার মতে, রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে সম্মানজনকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন। এতে নতুন সংসদ পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ পাবে।

তিনি আরও বলেন, অভিশংসনের পথে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই হবে রাজনৈতিকভাবে পরিণত সিদ্ধান্ত। কারণ অভিশংসন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে শহীদ মিনারের ব্যতিক্রমী আয়োজনকে ঘিরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে। এটি নিছক প্রোটোকলগত পরিবর্তন, নাকি রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য বিদায়ের ইঙ্গিত—তা স্পষ্ট হবে নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পরই।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদ ঘিরে সিদ্ধান্ত এখন সময়ের অপেক্ষা।

Leave a Reply

scroll to top