চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দেশের মোট আমদানি ও রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য এখানেই আসে। তাই বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে প্রভাব পড়ে শুধু বন্দর চত্বরেই নয়—ছড়িয়ে পড়ে শিল্পকারখানা, রফতানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সাধারণ ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
ছয় দিনের টানা কর্মবিরতির পর সীমিত কার্যক্রম শুরু হলেও বন্দরের কার্যক্রম এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কনটেইনারের পাহাড়, জাহাজের দীর্ঘ সারি ও শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে।
সংকটের সূত্রপাত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ৩১ জানুয়ারি থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো কার্যকর আলোচনা হয়নি। কয়েকজন কর্মচারীকে বদলি করায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। প্রথমে প্রতিদিন আট ঘণ্টার কর্মবিরতি, পরে তা টানা কর্মসূচিতে রূপ নেয়। একপর্যায়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
সীমিত কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাভাবিক অপারেশন এখনও ব্যাহত। বন্দরের জোয়ার-ভাটার সময়সূচি, রাতের সময় চলাচলের সীমাবদ্ধতা ও টানা অচলাবস্থার ধাক্কায় পুরো সিস্টেম কার্যত স্থবির। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) জাহাজগুলো জেটিতে আনা হলেও বিকেলের মধ্যে পুরোপুরি অপারেশনাল গতি পাওয়া যায়নি। ট্রাকের দীর্ঘ সারি কনটেইনার ওঠানামার সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে ৩৮ হাজারের বেশি টিইইউএস কনটেইনার জমে আছে। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার ফ্রেইট কনটেইনার (FCL) সরাসরি আমদানি ও রফতানির সঙ্গে যুক্ত। রফতানি কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজারের বেশি পণ্য বেসরকারি ডিপোতে আটকে আছে। বহির্নোঙরে ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ ও ১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার অপেক্ষমাণ। প্রতিদিন নতুন জাহাজ আসায় ডেমারেজ চার্জ প্রতি জাহাজ ১৫–২০ হাজার ডলার, যা কয়েক দিনের মধ্যে শত শত কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে তৈরি পোশাক খাত। ফিডার ভেসেলগুলো নির্ধারিত কনটেইনার না নিয়েই বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজান মনে করছেন, এই জট অন্তত দুই থেকে আড়াই মাসে সমাধান সম্ভব। এতে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতাও বিপন্ন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থার কারণে প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আটকে রয়েছে আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলারের রফতানি পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচেম বাংলাদেশ) জানিয়েছে, দেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা রফতানি কার্যক্রম ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
গার্মেন্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)ও দ্রুত স্বাভাবিক অপারেশন এবং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট এখন শুধুমাত্র শ্রমিক আন্দোলন নয়—এটি জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা। সংলাপ, সমঝোতা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছাড়া সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন।
চট্টগ্রাম বন্দর শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। একদিনের অচলাবস্থাই হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।