দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে চরমভাবে প্রভাবিত হচ্ছে সামাজিক স্থিতি ও নাগরিক নিরাপত্তা। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রায় প্রতিটি শহর ও জেলা শহরে এই অপরাধচক্রের প্রভাব দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শুধু ছিনতাই বা মারামারি নয়—এরা জড়াচ্ছে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দখলদারি ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে ২৩৭টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায়ই ১২৭টি গ্যাং। মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গ্যাং সংস্কৃতির পেছনে রয়েছে একাধিক সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ—দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও বিনোদনের অভাব, সহিংস কনটেন্টে আসক্তি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসান এ শাফী বলেন, ‘‘আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা এই তরুণরা গ্যাংকে সম্মান ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখে।’’
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলের মদদে গ্যাংগুলো মিছিল-মিটিং বা প্রতিপক্ষ দমন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অপরাধীরা আইনকে ভয় পায় না এবং গ্যাং কালচারের বিস্তার পায়।
এদিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, কিশোরদের অনেকেই ‘কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার’-এর মতো মানসিক জটিলতায় ভুগছে। সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি তাদের অনীহা ও সহিংস প্রবণতা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “এদের শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, সংশোধনের উপযোগী মানুষ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।”
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ডেপুটি কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, পুলিশের নজরদারি থাকলেও সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কিশোর অপরাধ ঠেকাতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন মানবিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কর্মমুখী শিক্ষা ও মানসিক সাপোর্ট ব্যবস্থার অভাব পূরণ না হলে এই গ্যাং সংস্কৃতি ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী কাঠামোতে পরিণত হতে পারে।