চায়ের শহর মৌলভীবাজার। জেলার ৯২টি চা বাগানের বড় একটি অংশ পড়েছে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে। বরাবরের মতো এই আসনের ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন চা শ্রমিকরা। বিশাল এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভোট যেদিকে যায়, জয়ের পাল্লাও সাধারণত সেদিকেই ভারী হয়।
এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই প্রার্থীরা এখন চা বাগানগুলোতে প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মৌলভীবাজার জেলায় মোট চারটি সংসদীয় আসন রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার-৪ আসনটি রাজনৈতিকভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। কারণ, এ আসনে চা শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রভাব নির্ধারক।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের এই চায়ের জনপদ এখন প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। এ আসনের মোট ভোটারের বড় একটি অংশই চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য।
ফিনলে, ডানকান ব্রাদার্স, বাংলাদেশ টি বোর্ড, ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি), ব্যক্তি মালিকানাধীনসহ ছোট-বড় বিভিন্ন বাগানে প্রায় লক্ষাধিক চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত। ফলে নির্বাচনী প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে চা বাগানগুলো।
এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রার্থীরা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। চা শ্রমিকরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে থাকেন, যা প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব ফেলে।
গত কয়েক দিন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ পথসভার তুলনায় বাগানভিত্তিক উঠান বৈঠক ও শ্রমিক সমাবেশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা। তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দৈনিক মজুরি পুনর্নির্ধারণ, দীর্ঘদিনের দাবি ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা, বাগান এলাকায় উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-দলই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরী জানান, চা শ্রমিকদের মজুরি, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। প্রার্থীরা প্রতিবারই ভোটের আগে এসে নানা আশ্বাস দেন। তবে এবার শ্রমিকরা সচেতন। যে প্রার্থী আবাসন ও রেশন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবেন, তাকেই সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চান তারা।
কানিহাটি চা বাগানের শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, “আমাদের ভোটেই যেহেতু জয়-পরাজয় নির্ভর করে, তাই এবার হিসাব করেই ভোট দেব। তবে চা বাগানের ভোটারদের মধ্যে এখনো হ্যাঁ বা না ভোট নিয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। কোনো প্রার্থীর পক্ষ থেকেও জোরালো প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না।”
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে যেকোনো দলের জয়ের ক্ষেত্রে চা শ্রমিকরাই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হন। স্থানীয়দের মতে, চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ রাজনীতির জটিল সমীকরণে খুব বেশি যুক্ত নন। ফলে যেসব প্রার্থী সরাসরি তাদের কাছে যান, খোঁজখবর নেন এবং উন্নয়নের আশ্বাস দেন, শ্রমিকরা সহজেই তাদের প্রতি আস্থা তৈরি করেন।
স্থানীয় ভোটাররা জানান, গত কয়েকটি নির্বাচনে চা শ্রমিকদের বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। দিনের ভোট রাতে হওয়া এবং একাধিক ‘ডামি’ প্রার্থীর উপস্থিতির কারণে অনেক শ্রমিক ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। ফলে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সীমিত ছিল। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এখনো পিছিয়ে থাকার বাস্তবতা থেকেই এবার তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন।
স্থানীয়দের মতে, যেসব প্রার্থী সত্যিকার অর্থে চা শ্রমিকদের বাস্তবতা অনুধাবন করবেন এবং নির্বাচনের পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গীকার দেখাবেন, তারাই এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভোটে এগিয়ে থাকবেন।
এ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, ১১ দলীয় জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী প্রীতম দাশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ নূরে আলম হামিদী, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া মধুসহ অন্যান্য প্রার্থীরা শ্রমিকদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়ে সরাসরি যোগাযোগ, উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণ বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক প্রার্থী শ্রমিকদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেও তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের কঠোরভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মাইকিং না করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধানের শীষ), জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী প্রীতম দাশ (শাপলা কলি), বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া মধু (ফুটবল), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী শেখ নূরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন (লাঙল) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মো. আবুল হাসান (মই)। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮ জন।