এক-এগারোর অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং সাবেক নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অবশেষে মুখ খুলেছেন। বর্তমানে রিমান্ডে থাকা এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সে সময়ের ক্ষমতার লড়াই, সেনাপ্রধানের সঙ্গে মতবিরোধ এবং রাজনীতিতে সুশীল সমাজের হস্তক্ষেপ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে জেনারেল মাসুদ দাবি করেছেন, সেনাবাহিনী প্রধানত বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিল না। কোর কমান্ডারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত ছিল তাঁদের বড়জোর গৃহবন্দি রাখা বা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু সে সময়ের প্রভাবশালী ‘দুই সম্পাদক’ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের তীব্র চাপে শেষ পর্যন্ত তাঁদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। মাসুদ উদ্দিনের ভাষ্যমতে, ওই দুই সম্পাদক তাকে বলেছিলেন— “দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে না সরালে দেশে কোনো সংস্কার সম্ভব নয়।” এর প্রেক্ষিতেই পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমগুলোতে পরিকল্পিত জনমত তৈরির চেষ্টা করা হয়।
২০০৫ সালে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সাতজনকে টপকে জেনারেল মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করায় বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি বিকল্প খুঁজতে থাকেন। ২০০৬ সালের শেষের দিকে একজন প্রভাবশালী সম্পাদকের আমন্ত্রণে গুলশানের এক শিল্পপতির বাসায় নৈশভোজে অংশ নেন তিনি। সেখানেই প্রথমবারের মতো সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী এবং সম্পাদকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গোপন আলোচনা হয়। এই বৈঠকই মূলত এক-এগারোর পটভূমি তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে বৈঠকেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সরকারকে সরানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে জেনারেল মইন যখন এরশাদের আদলে ‘কিংস পার্টি’ গঠন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করেন, তখন থেকেই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনটি ছিল মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সমঝোতার ফসল। এই সমঝোতার কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বহাল রাখে এবং ব্রিগেডিয়ার বারী ও আমিনের মতো কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পল্টন মডেল থানার মামলা এবং দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় দফায় দফায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। সর্বশেষ ১১ এপ্রিল আদালত তাকে পুনরায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূলত এক-এগারোর পেছনের গভীর ষড়যন্ত্র এবং সেই সময়ের অপ্রকাশিত সত্য উদ্ঘাটনেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ও নিজস্ব সূত্র।





