রাজস্ব ঘাটতি না কমলেও শুল্কছাড়ে ‘উদার’ সরকার

57a75c947ac50c23b4bdd8c422e5037a.jpg
মো: আল মামুন নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক স্থবিরতা নেমেছিল, যা রাজস্ব আহরণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছিল। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঘাটতি কমাতে পারছে না। বিপরীতে, সরকারের শুল্কছাড়ের ‘উদারতা’ আরও অর্থসংকট তীব্র করছে।

তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০.৪৮% বেশি। অর্থনীতিবিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজস্ব আহরণের ঘাটতির মধ্যেও শুল্কছাড় বাড়ানো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাপ বাড়িয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যপূরণে ঘাটতি রয়ে গেছে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর (২০২৩-২৪) রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩%, তবে ঘাটতি ছিল ১৯.৯৮%।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোন, পোলট্রিশিল্প, ফ্রিজ-এসি, ভোজ্যতেল, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সরকারি বিভিন্ন খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৫ হাজার ৭১২ কোটি টাকার তুলনায় বেশি।

শুল্কছাড়ের ফলে ভোক্তাদের মূল্যসুবিধা এসেছে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মোবাইল ফোনে শুল্কছাড় থাকা সত্ত্বেও দাম কমেনি। পোলট্রিশিল্পে ছাড়ের পরও ডিম-মুরগির দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, “শুল্কছাড়ে বড় ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারছে না।”

ফ্রিজ ও এসি উৎপাদনের উপকরণেও ছাড় দেওয়া হয়েছে ৭১৪ কোটি টাকা, তবে দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের বলেন, “শুল্কছাড়ের সুফল ভোক্তাদের পৌঁছাচ্ছে না। বড় ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা দখল করছে।”

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় দেখা গেছে, করছাড় ও স্বল্প করহার জিডিপির সঙ্গে রাজস্বের অনুপাত ২.২৮% কমিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখনও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতে দুই অঙ্কে যেতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অব্যাহত করছাড়ের কারণে সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ১১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “করছাড় পুরোপুরি তুলে দেওয়া যাবে না, তবে যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে করছাড় কমানো জরুরি।” ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, “কিছু খাতে ছাড় দরকার, তবে প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি।” জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য আবদুল মান্নান পাটোয়ারী যোগ করেন, “জনস্বার্থে ছাড় দিতে হয়, তবে সব সময় ভোক্তারা সুবিধা পায় না; ব্যবসায়ীরা আগে লাভ দেখবে।”

Leave a Reply

scroll to top