বিএনপির জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে জামায়াতের ‘ডোর টু ডোর’ কৌশল

1770565982-d0f0bb03d424c2cc9862e5554cff7921.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগ–পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পর দুই দল এখন নির্বাচনী মাঠে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি দৃশ্যমান জনসমর্থনে এগিয়ে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী সংগঠিত তৃণমূল প্রচারণার মাধ্যমে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বড় জনসভা ও জনসমাগমে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত ‘ডোর টু ডোর’ বা ঘরে ঘরে প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। ফলে জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠনের প্রতিযোগিতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দাবি। তাদের মতে, ওই সময় দুই দলের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চালানো হয়। বিএনপির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের মতো ঘটনাগুলো দলটির প্রতি সহানুভূতি তৈরি করেছে। অন্যদিকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় দলটির নেতৃত্ব সংকটে পড়েছিল বলেও বিশ্লেষকদের মত।

গত ২৬ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার পর নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি নতুন গতি পেয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় তার জনসভায় ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি দলটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বক্তব্য ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় জনসভা ভোটে পরিণত করতে শক্ত সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রয়োজন, যেখানে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দলটির নারী কর্মীরা পাড়া-মহল্লায় গিয়ে ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, কিছু এলাকায় জামায়াত কর্মীরা ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছে। বিএনপি এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করে বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম নির্বাচনী আচরণবিধির পরিপন্থি এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন অঞ্চলে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফরিদপুরের কয়েকটি আসনে জামায়াতের সংগঠিত প্রচারণা চোখে পড়লেও কিছু এলাকায় বিএনপি প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। খুলনা অঞ্চলেও জামায়াত আগের তুলনায় সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলেও দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। এসব এলাকায় ভোটারদের একটি অংশ দল নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।

বরিশাল অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। কিছু আসনে ইসলামী ধারার রাজনীতির প্রভাব বাড়ায় বিএনপির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলেও বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী থাকলেও জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা জোরদার করেছে।

রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোটারদের অবস্থান নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ, তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রচারণার সঙ্গে তাল মেলানোর বিষয় উল্লেখযোগ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, বিএনপি জনসমর্থনে এগিয়ে থাকলেও জামায়াতের তৃণমূলভিত্তিক প্রচারণা ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত সংগঠিত কর্মীবাহিনীর কারণে শক্ত অবস্থানে থাকলেও দলটির জনসমর্থন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক কৌশলের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কোন কৌশল সফল হবে।

 

 

Leave a Reply

scroll to top