শিক্ষা মন্ত্রণালয় পবিত্র রমজান মাসে মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রমজানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই পর্যন্ত গড়িয়েছে বিষয়টি।
এক আইনজীবীর করা রিটের পর বাংলাদেশ হাইকোর্ট রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ–এর চেম্বার আদালত হাইকোর্টের নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে বিষয়টি এখন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষকদের আন্দোলন, বৈরী আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর নির্ধারিত পাঠদান সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)–এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করেই পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। কোথাও কোথাও বছরে ১০০ দিনেরও কম ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীন বলেন, ফেব্রুয়ারি-মার্চ সময়টিই সাধারণত নিরবচ্ছিন্ন পাঠদানের জন্য উপযোগী। কিন্তু এবার এই সময় রমজান পড়ায় ক্লাসের ঘাটতি পূরণে রোজার প্রথমার্ধে বিদ্যালয় খোলা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রমজানে ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ছুটি ছিল ৭৬ দিন, এবার তা কমিয়ে ৬৪ দিন করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, গত বছর শিক্ষক কর্মবিরতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উল্লেখযোগ্য সময় ক্লাস বন্ধ ছিল। এজন্য ছুটি কমিয়ে পাঠদান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, রমজানে স্কুল খোলা রাখলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল–এর এক শিক্ষক জানান, অনেক শিক্ষার্থী রোজা রেখে ক্লাসে আসতে অনীহা দেখায়।
অন্যদিকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ–এর শিক্ষক সাইদুল ইসলাম মনে করেন, সময়সূচি কমিয়ে সীমিত আকারে ক্লাস চালু রাখলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে পারে।
শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমদ, যিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়–এর ইমেরিটাস অধ্যাপক, বলেন—শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাস্তব সমস্যা। তবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে ক্লাসের সময় কমানো বা প্রতিদিন কম সংখ্যক বিষয় পড়ানোর মতো বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, রমজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা ও ধর্মীয় বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।