সরিয়ে দেওয়া হলো মনসুরকে, ব্যাংক খাত সংস্কারের কী হবে?

91ab04e659903b235c890483f4339898-5727629256488.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকিং খাতে সংস্কার জোরদারের মাঝপথেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বর্ষীয়ান অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। হঠাৎ এই পরিবর্তনে ব্যাংকপাড়া থেকে অর্থনীতিবিদ—সবার মুখে এখন একটাই প্রশ্ন, চলমান সংস্কার কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী?

ড. মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন, তদারকি জোরদার এবং নীতিগত কঠোরতার বার্তা দিয়ে আলোচনায় ছিলেন। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তকরণ এবং শ্রেণিকরণে স্বচ্ছতা—এসব উদ্যোগ ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের শিথিলতার বিপরীতে কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

বিশেষ করে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ধারার ব্যাংক—এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন—একীভূত করে একটি বড় সম্মিলিত ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকার এ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য মূলধন সহায়তাও দেয়। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য ছিল, অস্থিরতা কাটিয়ে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই মূল লক্ষ্য।

তবে এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেন—এমন অভিযোগে তিনজনকে শোকজ ও বদলি করা হয়। এর প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সভা, কলম-বিরতির হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গভর্নর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে জনস্বার্থে আদেশ জারি করা হয়েছে।

দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ড. মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, “আমি পদত্যাগ করিনি, আমাকে সরিয়েও দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমে দেখেছি, তাই বাসায় যাচ্ছি।” এই বক্তব্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দায়িত্ব নেন। পরে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে এই রদবদল ঘটে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “নতুন সরকার এসেছে, পরিবর্তন স্বাভাবিক।”

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন স্বীকৃত কস্ট ও ব্যবস্থাপনা হিসাববিদ। তিনি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ থেকে সনদপ্রাপ্ত। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি দীর্ঘদিন রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। অতীতে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড-এর পরিচালনা পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে একজন সক্রিয় শিল্পোদ্যোক্তার নিয়োগ স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে কি না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে একজন পেশাদার হিসাববিদ ও ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাঁর মতে, ব্যবসায়িক পটভূমি থাকলে বাজার ও করপোরেট স্বার্থ অগ্রাধিকার পাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির বলেন, ড. মনসুরকে নিয়োগের সময় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন—এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করেছিলেন।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই আশাবাদ কমেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দীর্ঘ সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে; শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমেছে; প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, সমস্যার গভীরতার কথা শোনা গেছে বেশি, সমাধানের দৃশ্যমান ফল কম দেখা গেছে।

নতুন গভর্নরের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করছি না। অন্তত অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ও স্থিতিশীলতা ফিরুক—ব্যবস্থা এমন হোক, যাতে টেকসই ফল পাওয়া যায়।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ আশঙ্কা করছেন, অর্থনীতি আবার অনিশ্চয়তার পথে যাবে; কেউ মনে করছেন, হিসাববিদ পটভূমির একজন গভর্নর আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ এবং নীতিনির্ধারণে স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ব্যাংক খাত এখনও বহুমাত্রিক সংকটে—খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সমস্যা, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ। ড. মনসুরের সময়ে কিছু পণ্যের দাম কমা ও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ—এসবকে সমর্থকেরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সমালোচকেরা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার এখনও পূর্ণতা পায়নি।

নতুন গভর্নরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো—সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং রাজনৈতিক ও করপোরেট চাপ থেকে প্রতিষ্ঠানকে দূরে রাখা।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিলেও কাঠামোগত সংস্কারের মূল প্রস্তাব—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন—এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে সংশোধনী আটকে আছে।

বিদায়ের আগে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজুলিউশন ও ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ জারি করে। এগুলো দেউলিয়া ব্যাংক সামাল দেওয়া ও আমানতের আংশিক সুরক্ষার কাঠামো দেয়, কিন্তু মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদারের সুপারিশ করলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক কমলেও খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী মালিকদের প্রভাব ও দুর্বল তদারকির মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, গভীর সংস্কার ছাড়া একীভূতকরণ কেবল সময় কেনার কৌশল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আর্থিক খাতের দিকনির্দেশনার প্রশ্ন। সংস্কার কি ব্যক্তিনির্ভর, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ব্যাংকিং বাস্তবতা। এখন সবার নজর নতুন গভর্নরের প্রথম পদক্ষেপের দিকে। কারণ ব্যাংক খাতের আস্থা একবার নড়বড়ে হলে তা পুনর্গঠন করতে সময় লাগে বহু বছর।

 

Leave a Reply

scroll to top