প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ, সিসিডিএম কর্তারা অসহায়; বিকার নেই বিসিবি সভাপতির

bulbul-mmg9xcfx560n9wx-20260307180257.webp
নিজস্ব প্রতিবেদক বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশ একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ। সেই হিসেবে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রধান আসর হওয়ার কথা জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল)। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কঠিন সত্য হলো—এনসিএল বা বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) এখনো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট আসর হয়ে উঠতে পারেনি।

অনেকে অবশ্য বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) কথা বলতে পারেন। কিন্তু একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো শুধুমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টি–টোয়েন্টি লিগ দিয়ে বিচার করা যায় না। ভারতের আইপিএল কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশের সঙ্গে তুলনা টানা হলেও সেখানে শক্তিশালী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কাঠামো রয়েছে। ভারতের রঞ্জি ট্রফি, দুলীপ ট্রফি কিংবা দেওধর ট্রফির মতো টুর্নামেন্টে ক্রিকেটাররা উল্লেখযোগ্য পারিশ্রমিক পান, যা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বিপিএল খেলেও পান না।

বাহ্যিক চাকচিক্য ও জমকালো আয়োজনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিপিএল ধীরে ধীরে একটি সাব-স্ট্যান্ডার্ড টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। পার্থক্য শুধু একটাই—ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে বিদেশি ক্রিকেটার নেই, আর বিপিএলে মাঝারি মানের কিছু বিদেশি খেলেন।

বাস্তবে গুরুত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আকর্ষণ ও ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ—সবকিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট আসর এখনো ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল)। এর অন্যতম কারণ, দেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট কাঠামো এখনো ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে বিসিএল বা এনসিএলে যে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ মেলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে।

এই কারণেই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ২০০ ক্রিকেটার প্রতি বছর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার জন্য অপেক্ষা করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন জাতীয় দলের ক্রিকেটারও থাকেন। এছাড়া আরও অনেক ক্রিকেটার আছেন যারা বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে মাসিক বেতন পান কিংবা জাতীয় লিগ খেলেন। বিপিএলেও অনেকে ভালো পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন।

কিন্তু এর বাইরে অন্তত দেড় শতাধিক ক্রিকেটার আছেন যাদের প্রধান আয়ের উৎসই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। প্রায় শতাধিক ক্রিকেটারের সারা বছরের আয় নির্ভর করে এই লিগের ওপর।

সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মাঠে গড়ায়। ক্রিকেটাররা পছন্দের দল বেছে খেলেন এবং মৌসুম শেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা চুক্তির বড় অংশের পারিশ্রমিক পেয়ে যান। সেই অর্থ দিয়েই অনেক ক্রিকেটারের সংসার চলে।

কিন্তু চলতি বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কোনো খবর নেই। ক্রিকেটাররা জানেন না—এই বোর্ডের অধীনে আদৌ লিগ হবে কি না।

গত কয়েক বছরে রমজান মাসেই লিগ শুরু হয়েছে। চলতি বছরও সিসিডিএমের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির ১৫ ও ১৬ তারিখ দলবদল হওয়ার কথা ছিল এবং মার্চে লিগ শুরুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি।

ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের আয়োজক সংস্থা ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস (সিসিডিএম) কার্যত নীরব। কারণ তাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। বিসিবির নির্বাচনে অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ক্লাব সেই নির্বাচন বয়কট করেছে। ফলে ক্লাবগুলোর বড় অংশ বর্তমান বোর্ডের অধীনে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে অনাগ্রহী।

এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিভাগ লিগ আয়োজনই সম্ভব হয়নি। বিসিবি নিজেদের অর্থায়নে সীমিত পরিসরে দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ লিগ আয়োজন করলেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে পড়েছে।

ক্লাবগুলোর অবস্থান স্পষ্ট—বর্তমান বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের অধীনে তারা প্রিমিয়ার লিগ খেলতে আগ্রহী নয়। মোহামেডান, আবাহনীসহ বড় ক্লাবগুলোও একই অবস্থানে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২টি ক্লাবের মধ্যে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি ক্লাব হয়তো এই বোর্ডের অধীনে লিগ খেলতে রাজি হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্লাব এখনো তাদের অবস্থানে অনড়।

এদিকে বিসিবি নিজেদের উদ্যোগে তিন দলের একটি সীমিত পরিসরের টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে। সেখানে প্রায় ৪৫ জন ক্রিকেটার অংশ নিয়ে কিছু পারিশ্রমিক পেয়েছেন। কিন্তু সেই টুর্নামেন্টে যারা সুযোগ পাননি, তাদের জন্য প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ থাকা মানে পুরো মৌসুমের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রিমিয়ার লিগ না হলে শতাধিক ক্রিকেটার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রশ্ন উঠছে—যে লিগ শতাধিক ক্রিকেটারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম, সেই লিগ আয়োজন নিয়ে বিসিবির কোনো তৎপরতা কি আছে?

সিসিডিএমের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিসিবি সভাপতি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দেশের বাইরে রয়েছেন। তাদেরকে এখনো প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

সিসিডিএমের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ফায়েজুর রহমান মিতুও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট দেশে নেই। আমাদের কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। তাই আমরা উদ্যোগ নিতে পারছি না।”

এই অবস্থায় ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানের উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।

ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মতে, বোর্ড সভাপতি চাইলে ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে অন্তত একটি সমাধানের চেষ্টা করতে পারতেন। বিসিবি নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ক্রিকেটারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ক্লাবগুলোকে লিগে অংশ নিতে অনুরোধ করা যেত।

কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো উদ্যোগের খবর নেই। বরং বিসিবি সভাপতি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

ফলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বর্তমান বোর্ডের অধীনে চলতি মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আয়োজনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়।

ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই লিগ আয়োজন করতে না পারা বিসিবির জন্য বড় ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

Leave a Reply

scroll to top