পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক যাকাত বণ্টনের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য অনেকাংশে দূর করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে যাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা গেলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শনিবার (৭ মার্চ) রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আলেম-ওলামা, মাশায়েখ ও এতিম শিশুদের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামী বিধান অনুযায়ী যাকাত এমনভাবে বণ্টনের কথা বলা হয়েছে যাতে একজন যাকাতগ্রহীতা একবার সহায়তা পাওয়ার পর পরবর্তী বছর আর যাকাতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিকল্পিতভাবে যাকাত বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে যদি প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে পাঁচ লাখ পরিবারকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত যাকাত দেওয়া যায়, তাহলে তাদের অনেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী অতীতের প্রায় প্রতিটি রমজানেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মানে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হতো। আলেম-ওলামা, মাশায়েখ ও এতিমদের সম্মানে সাধারণত রমজানের শুরুতেই এই আয়োজন করা হলেও দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এবার কিছুটা দেরিতে আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে এবারের রমজানে সীমিত পরিসরে ইফতার আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল ও আজ—এই দুই দিন মিলিয়ে মোট দুটি ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ বছর এটিই হয়তো বড় পরিসরের শেষ ইফতার আয়োজন।
ইফতার মাহফিলে এতিম শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই আয়োজনে এতিম শিশুরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিমদের অধিকার আদায়ে মুমিন মুসলমানদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সমাজের বিত্তবানদের প্রতি এতিমদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক বিত্তবান ব্যক্তি যদি ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী এতিমদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে পিতৃহারা শিশুদের জন্য সমাজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রমজান মাসের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র রমজান ত্যাগ, সংযম ও রহমতের মাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু অসাধু ব্যক্তি এই মাসেও অশুভ পন্থায় লাভের চেষ্টা করে। তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি মানুষের কষ্ট বাড়ায় এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
যাকাত ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির একটি হলো যাকাত। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি যাকাত দেওয়া হয়। কিন্তু সুসংহত পরিকল্পনার অভাবে এই অর্থ দারিদ্র্য বিমোচনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। এ বিষয়ে আলেম-ওলামাদের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, বিত্তবানদের সচেতন করতে আলেম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রয়োজনে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাকাত বোর্ড পুনর্গঠন করেও একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাকাতকে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্বের সামনে একটি মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
ইফতার মাহফিলে ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সমাজকল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম, আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমেদুল্লাহ এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকসহ বিভিন্ন আলেম-ওলামা, মাশায়েখ ও এতিম শিশুরা অংশ নেন।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ছালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।





