নড়বড়ে রেলপথে ঝুঁকি নিয়েই পশ্চিমাঞ্চলে ঈদযাত্রা

3363b2b54f6ae714d353f07fa7f38bdc-69b438d00f519.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

বয়সের ভারে সক্ষমতা হারিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অনেক রেলপথ। কোথাও লাইন দেবে যাচ্ছে, কোথাও ভাঙা, আবার মাঝেমধ্যেই ঘটছে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে। প্রায় শতবর্ষ পুরোনো এই রেলপথ এখন বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে মেরামত করে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে বিভিন্ন স্থানে দ্রুতগতিতে রেলপথ সংস্কার, রেলক্রসিং এবং কোচ বা বগি মেরামতের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, ঈদের আগেই এসব কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের একটি অংশে—২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০ কিলোমিটার পর্যন্ত—মোট ৫৯টি জয়েন্ট রয়েছে। এসব জয়েন্টে ২৩৬টি নাট-বোল্ট থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১৮৯টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই এক কিলোমিটার অংশের চিত্রই যেন পুরো পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের অবস্থা তুলে ধরে।

স্থানীয় বাসিন্দা আশিক বলেন, ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের প্রতিটি জয়েন্টে কাঁপন অনুভূত হয়। নাট-বোল্ট কম থাকায় প্রতিটি জয়েন্টে বিকট শব্দ হয়। তিনি জানান, এই রুটে প্রতিদিন লোকাল ও আন্তনগর মিলিয়ে প্রায় ১৭টি ট্রেন চলাচল করে।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মী জানান, জনবসতি ও ফাঁকা এলাকায় প্রায়ই নাট-বোল্ট চুরি হয়ে যায়। ফলে অনেক জায়গায় রেললাইনে এসবের ঘাটতি দেখা যায়।

এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভিন্ন স্থানে ট্রেন উঠলেই স্লিপার দেবে যাওয়ার ঘটনা দেখা যায়। কোথাও স্লিপার ভাঙা, কোথাও ক্লিপ নেই। আবার অনেক জায়গায় রেললাইন উঁচু-নিচু ও আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে এবং পাথরেরও ঘাটতি রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত বছর পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের কমপক্ষে আড়াইশো স্থানে লাইন ভেঙেছে। এতে একদিকে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে, অন্যদিকে কমে গেছে ট্রেনের গতি।

তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ শুরু করেছে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল। রেলপথ সংস্কার, রেলক্রসিং মেরামত, লাইনের আগে-পরে অংশ ঠিক করা এবং কোচ মেরামতের কাজ চলছে পুরোদমে। বিশেষ করে রাজশাহী–জয়দেবপুর প্রকৌশলী বিভাগের আওতাধীন রেলপথে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে দুটি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে। ট্রেন দুটি জয়দেবপুর থেকে পার্বতীপুর রুটে চলাচল করবে। তবে এবারও রাজশাহী–চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে কোনো বিশেষ ট্রেন রাখা হয়নি।

বিশেষ ট্রেন দুটির নাম ‘পার্বতীপুর স্পেশাল’ ও ‘জয়দেবপুর স্পেশাল’। পার্বতীপুর স্পেশাল ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে সকাল ১১টায় ছেড়ে জয়দেবপুর পৌঁছাবে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে। আবার জয়দেবপুর থেকে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে ছেড়ে পার্বতীপুর পৌঁছাবে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে।

অন্যদিকে জয়দেবপুর স্পেশাল ট্রেনটি জয়দেবপুর থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় ছেড়ে পার্বতীপুর পৌঁছাবে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে। ফের পার্বতীপুর থেকে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে ছেড়ে জয়দেবপুর পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে।

ট্রেন দুটি চাটমোহর, ঈশ্বরদী বাইপাস, নাটোর, আহসানগঞ্জ, জয়পুরহাট, বিরামপুর ও ফুলবাড়ি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। প্রতিটি ট্রেনে আসনসংখ্যা থাকবে ৭৮৬টি। প্রয়োজনে যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী কোচ সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে ও পরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। যাত্রীচাপ বেশি এমন ট্রেনগুলোতে বাড়তি চেয়ার ও স্লিপার কোচ যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে পর্যাপ্ত কোচ ও লোকোমোটিভ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাত্রীদের আরামদায়ক ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে।

তিনি আরও জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার এবং এই রুটে প্রায় ১২০টি ট্রেন চলাচল করে। পুরোনো অবকাঠামোর কারণে সক্ষমতা কমলেও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মেরামতের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ে জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চল রুটে প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রী বসে এবং সাড়ে ১৩ হাজার যাত্রী দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

 

Leave a Reply

scroll to top