ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রতি বছরই ঈদের আগে কিছু কারখানায় বেতন-বোনাস দিতে বিলম্ব হওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। এবার নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি কেমন হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ঈদ উপলক্ষে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ৯ মার্চের মধ্যে এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোর জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করেছে, যাতে মালিকরা শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন।
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সচল এবং সরাসরি রফতানিমুখী কারখানাগুলোর শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, অনেক কারখানা সরাসরি রফতানির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। এসব কারখানার অবস্থাও বিজিএমইএ পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, সরকারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে গেলেও বেশিরভাগ কারখানা ঈদের আগে ১৮ মার্চ পর্যন্ত খোলা থাকবে। এই সময়ের মধ্যেই শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধ সম্পন্ন করার জন্য মালিকপক্ষ কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এবার ঈদের আগেই অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
তবে শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, এখনও প্রায় ১৮০টি গার্মেন্ট কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধে ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে তিন শতাধিক কারখানা জানুয়ারি মাসের বেতনও পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে শুধু নির্দেশনা নয়, নিয়মিত তদারকি ও সমন্বয় জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মালিকপক্ষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রফতানি আয়ের ধীরগতি এবং আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করলেও সরকার বলছে, বিশেষ ঋণ সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে আর অজুহাত থাকার কথা নয়। এই ঋণের অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদনের অন্তত ৮০ শতাংশ রফতানি করে, তারা এই সুবিধা পাবে। ঋণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গত তিন মাসে পরিশোধিত গড় বেতন-ভাতার বেশি হবে না এবং বাজারভিত্তিক সুদহারে এই ঋণ দেওয়া হবে। এক বছরের মধ্যে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে শ্রমিকদের মানবিক দাবির মধ্যে রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান। তবে শ্রমিকদের প্রধান দাবি—ঈদের আগে সময়মতো বেতন ও বোনাস পরিশোধ।
শিল্প পুলিশ জানায়, দেশের ৯ হাজার ৪০৩টি কারখানার মধ্যে গত বছরের কোরবানির ঈদে ২৮৭টি কারখানা বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। চলতি বছরও প্রায় ১৮০টি কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জানুয়ারি মাসের বেতন দিতে পারেনি ৭৪৭টি কারখানা, যার মধ্যে ৩৫৭টি তৈরি পোশাক কারখানা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ৮৭টি কারখানাকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারখানায় বেতন-বোনাস না হলে শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ বা কারখানা ঘেরাওয়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় বিশেষ নজরদারি, ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান এবং শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা।
শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। মালিকপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারের সমন্বয়ে কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বেশিরভাগ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হবে।





