ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। নতুন সংসদের প্রথম বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অধিবেশন পরিচালনার জন্য একজন সদস্যকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রথম দিনের অধিবেশনে সভাপতিত্বের বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠক আগামী ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, প্রথম বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। সংসদের প্রচলিত রীতিতে বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এরপর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কার সভাপতিত্বে কার্যক্রম শুরু হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে কোনো সংসদ সদস্যকে অস্থায়ীভাবে সভাপতির দায়িত্ব দিতে পারেন।
প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতি হবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, “সংসদের একজন সিনিয়র সদস্যকে অস্থায়ী সভাপতি করা যেতে পারে। এটা কার্যবিধিতে আছে।”
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার প্রথমবারের মতো নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তবে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্ব পালনকারী এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। এ নিয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই।”
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যে কোনো সদস্য অন্য একজন সদস্যকে স্পিকার পদে নির্বাচিত করার প্রস্তাব দিয়ে সংসদ সচিবালয়ের সচিবের কাছে লিখিত নোটিশ দিতে পারেন। প্রস্তাবটি তৃতীয় একজন সদস্য দ্বারা সমর্থিত হতে হয়। পাশাপাশি প্রস্তাবিত সদস্য নির্বাচিত হলে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সম্মত—এমন লিখিত সম্মতিপত্রও নোটিশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয়।
কোনো সদস্য স্পিকার পদে নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারবেন না। নিজের নির্বাচনের সময় তিনি সভাপতিত্বও করতে পারবেন না।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে হচ্ছেন সভাপতি—এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বলেন, “সময় হলে টিভি স্ক্রলে দেখতে পাবেন। এখনো বলার সময় হয়নি।”
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। সাধারণত জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়েই এ শপথ অনুষ্ঠিত হয়। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তিনি সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এবং তার সভাপতিত্বেই ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে, নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত ফলাফলে ২৯৭ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১১টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে একটি আসন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন সাতটি আসন।
এককভাবে বিএনপি পেয়েছে ২০৮টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, খেলাফত মজলিস একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি–বিজেপি একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি এবং গণঅধিকার পরিষদ একটি আসন পেয়েছে।
স্পিকার হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। নরসিংদী-২ আসন থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক-এর নামও আলোচনায় রয়েছে।
ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ এবং নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।