প্রযুক্তির হাওয়ায় বদলে গেছে সময়, সমাজ ও মানুষের জীবনধারা। যাতায়াত এখন দ্রুত, সহজ ও তুলনামূলক আরামদায়ক। একসময় রাজধানী ঢাকা-কে বলা হতো ‘রিকশার শহর’। এখনও সেই পরিচয় রয়েছে, তবে রিকশার ধরনে এসেছে বড় পরিবর্তন। প্যাডেলচালিত রিকশার জায়গা দখল করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এতে যাত্রীদের সুবিধা বাড়লেও চরম সংকটে পড়েছেন প্যাডেল রিকশাচালকরা।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পড়ন্ত বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় নারী শিশু হাসপাতালের বিপরীত পাশের সড়কে কথা হয় রিকশাচালক আলমগীর হোসেনের সঙ্গে।
আলমগীর বলেন, “এখন আর প্যাডেল রিকশা তেমন চলে না। আগের মতো যাত্রীও পাওয়া যায় না। কেউ কেউ করুণা করে ওঠেন। শরীরের শক্তি বেশি লাগে, কিন্তু আয় কম।”
খুলনার তেরখাতা উপজেলার বাসিন্দা আলমগীর এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার অলিগলিতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। চুল-দাড়ি পেকে গেলেও শরীর এখনও টিকে আছে, তবে আগের মতো আর সাড়া দেয় না। একবার দীর্ঘ পথ প্যাডেল চালালে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করতে হয়।
কোনোদিন ৩০০, কোনোদিন ৪০০ টাকা আয় হয়। ৫০০ টাকা আয় করা তার জন্য এখন প্রায় অসম্ভব। রিকশা ভাড়া, মেসে থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে পরিবারের জন্য টাকা পাঠালে হাতে তেমন কিছুই থাকে না। অনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সন্তানের কথা মনে পড়লেই নিজেকে সংযত করেন।
বিকেলে যাত্রী না পেলে তিনি কাছের দেয়ালে সাঁটানো বিভিন্ন পত্রিকা পড়েন। তার ভাষায়, “যাত্রী টানতে টানতে যখন খুব ক্লান্ত হয়ে যাই, তখন এখানে এসে একটু পত্রিকা পড়ি। মনটা অন্যদিকে যায়।”
তিনি জানান, অধিকাংশ যাত্রী দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। অনেকে মাঝপথে নেমে যান শুধু দ্রুতগতির বাহন ধরার জন্য। আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা কম ছিল, তখন প্যাডেল রিকশারই চাহিদা ছিল। এখন যাত্রীরা আগে খোঁজেন অটো বা ব্যাটারিচালিত রিকশা।
আলমগীর ঢাকায় প্রথমে হকারি করতেন। পরে রিকশা চালানো শুরু করেন। এখন আবার আগের পেশায় ফিরতে চান, কিন্তু পুঁজি নেই। যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালিয়েই টানাটানি। ব্যবসার কথা ভাবাও কঠিন।
একই এলাকায় কথা হয় শেরপুরের কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। এক ছেলে ও এক মেয়েকে রিকশা চালিয়েই বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে থাকলেও খোঁজখবর তেমন নেন না। ফলে বার্ধক্যেও রিকশাই তার আয়ের একমাত্র ভরসা।
কামাল বলেন, “শরীর আর সায় দেয় না। কিন্তু কী করব? ছেলে থেকেও যেন নেই। তাই রিকশা চালাতেই হয়।”
রমজানে রোজা রেখেই রিকশা চালান তিনি। শুরু থেকে সব রোজা রেখেছেন। রোজা অবস্থায় যাত্রী টানতে তার কষ্ট হয়, তবুও উপায় নেই।
তিনি জানান, এখন যাত্রীরা প্যাডেল রিকশায় কম ওঠেন। কেউ কেউ ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে তাদের রিকশায় ওঠেন। আবার বয়স দেখে অনেকে ওঠার আগেই সিদ্ধান্ত বদলে নেমে যান।
রাজধানীর রাস্তায় প্রযুক্তির এই পরিবর্তন যাত্রীদের গতি বাড়ালেও কামাল-আলমগীরদের মতো অসংখ্য প্যাডেল রিকশাচালকের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। জীবিকার এই চাকার গতি যেন ধীরে ধীরে থমকে যাচ্ছে তাদের জন্য।