পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে

1772200815-1c9e811d7aa2c82afea9372336304b4c.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

তপ্ত রাজপথের পিচঢালা রাস্তা—যেখানে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রু মিশে ছিল—সেই ধূসর প্রান্তর পেরিয়ে আজ সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতারা। ‘পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে’—এই প্রশ্ন কেবল প্রতীকী নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের এক নতুন বাঁকের ইঙ্গিত।

২০০৭ সালের ১/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণআন্দোলন—এই সময়টুকু বিএনপির জন্য ছিল কঠিন পরীক্ষার। দলটির দাবি অনুযায়ী, হাজারো মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়েও তারা সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রেখেছে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ বিজয়কে সমর্থকেরা দেখছেন দীর্ঘ আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। রাজপথে আন্দোলনের সামনের সারির এই নেতা এখন প্রশাসনিক কাঠামোর শীর্ষে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা—দুটি ভিন্ন বাস্তবতা। আন্দোলনের স্লোগান যেখানে প্রতিরোধের ভাষা, সেখানে মন্ত্রণালয়ের ফাইল দাবি করে নীতিনির্ধারণ, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলে আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে প্রশাসনিক নেতৃত্বে রূপান্তর কতটা সফল হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিএনপির এই বিজয়ের পেছনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দীর্ঘ ত্যাগের কথা বারবার উঠে আসছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী গত ১৭ বছরে বাড়িছাড়া জীবন কাটিয়েছেন, মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসার পর এই তৃণমূলের কর্মীদের মূল্যায়ন ও সম্পৃক্ত করা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালী করা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হতে পারে একটি কার্যকর পদক্ষেপ।

দলের জ্যেষ্ঠ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ায় দলীয় অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, মন্ত্রীত্ব না পাওয়ার ক্ষোভ নয়; বরং প্রটোকল-সংক্রান্ত আচরণে তিনি অসন্তুষ্ট।

অন্যদিকে প্রবীণ নেত্রী সেলিমা রহমান-কেও এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও তাকে মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এসব ঘটনা দলীয় সংহতির প্রশ্নে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিগত শাসনামলের অভিযোগ—গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অর্থপাচার—এগুলোর বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা নিয়ে কূটনৈতিক ও আইনি আলোচনা চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিচার হতে হবে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে দীর্ঘ সংগ্রামের প্রকৃত মূল্যায়ন।

রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দল ক্ষমতায় এসে কখনও কখনও সেই ভুলগুলোই পুনরাবৃত্তি করে, যেগুলোর বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করেছিল। তাই বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন নিশ্চিত করা।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য ও সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন মন্ত্রিসভার ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, ১৭ বছরের সংগ্রামের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তিনি বলেন, “মানুষ দ্রুত পরিবর্তনের ফল দেখতে চায়। সরকার যদি কেবল প্রতিপক্ষের বিচারে ব্যস্ত থাকে এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।”

রাজপথ থেকে মন্ত্রণালয়ে এই যাত্রা কেবল গদির পরিবর্তন নয়; এটি শাসনদক্ষতার পরীক্ষাও। আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠ এখন প্রশাসনিক দায়িত্বে। জনগণের প্রত্যাশা—এই দায়িত্ব যেন ন্যায়, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে পালন করা হয়।

দেড় দশকের সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা নেতাদের সামনে এখন দুটি পথ—প্রতিশোধের রাজনীতি অথবা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, তারা কোন পথ বেছে নেন।

 

Leave a Reply

scroll to top