দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মাথায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই বিজয়ের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে দলটি, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী টাইম–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তাঁর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। তিনি জানান, ক্ষমতায় গেলে প্রথম লক্ষ্য হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দ্বিতীয় লক্ষ্য আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং তৃতীয় লক্ষ্য জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার কারণে দেশের সামাজিক বিভাজন তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা।
তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিভাজন দূর করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর হওয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ কয়েকটি অমীমাংসিত ইস্যু এখনো আলোচনায় রয়েছে। তারেক রহমান জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যেমন বোয়িং–এর সঙ্গে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতিও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মাধ্যমে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। তবে নির্বাচনের পর তরুণ সমাজের একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে হতাশ বলে পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠতে পারেন, যদি তিনি অর্থনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে সক্ষম হন। বিশেষ করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে তাঁর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সামনে যেমন বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বহু চ্যালেঞ্জ। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা— এই তিনটি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতিতে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





