বিশ্বজুড়ে বিচিত্র সেহরি ও ইফতার: ভিন্ন স্বাদ, অনুভূতি একই

e0fe072b44b1afa172903e19dedb999f-6995c9671df4c.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক

পবিত্র রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনেরও অনন্য প্রকাশ। দেশভেদে সেহরি ও ইফতারের খাবারে ভিন্নতা থাকলেও আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা ও ভাগাভাগির আনন্দ—এই চেতনা বিশ্বজুড়ে এক ও অভিন্ন। চলুন, বিশ্বজুড়ে বিচিত্র সেহরি ও ইফতার: ভিন্ন স্বাদ, অনুভূতি একই রমজান সংস্কৃতি ও খাবারের আরও বিস্তৃত চিত্র দেখে নেওয়া যাক তাহলে।

তুরস্ক: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

তুরস্কে রমজানকে ঘিরে বিশেষ সামাজিক আবহ তৈরি হয়। ঐতিহ্যগতভাবে ‘মাহইয়া’ নামে মসজিদের মিনারের মাঝে আলোকসজ্জা করা হয়। সেহরিতে পনির, জলপাই, ডিম ও তাজা রুটি জনপ্রিয়।

ইফতারে ‘রামাজান পিদেসি’ রুটি ছাড়া আয়োজন যেন অসম্পূর্ণ। বড় শহরগুলোতে ইফতার অনেক সময় পারিবারিক মিলনমেলা বা রেস্তোরাঁকেন্দ্রিক সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।

সৌদি আরব: ধর্মীয় আবহে রমজান

ইসলামের জন্মভূমি সৌদি আরবে রমজানের আবহ গভীরভাবে ধর্মীয়। মক্কা ও মদিনায় হাজারো মুসল্লি একসঙ্গে ইফতার করেন।

সেহরিতে হালকা খাবার গ্রহণের প্রচলন বেশি। ইফতারে কাবসা বা মান্দির পাশাপাশি আরব কফি ও খেজুর অপরিহার্য। অনেক পরিবার গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণ করে, যা রমজানের সামাজিক দিককে শক্তিশালী করে।

মরক্কো: পারিবারিক বন্ধনের উৎসব

মরক্কোয় রমজান মানেই পরিবারের সবাই একসঙ্গে ইফতার। ‘হারিরা’ স্যুপ প্রায় প্রতিটি ঘরেই তৈরি হয়।

রমজান মাসে বাজারে মিষ্টি ও খেজুরের চাহিদা বেড়ে যায়। রাত গভীর পর্যন্ত সামাজিক আড্ডা ও ইবাদতে সময় কাটানোর সংস্কৃতি রয়েছে সেখানে।

ভারত: বহুসাংস্কৃতিক রমজান

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে রমজানের খাবারে আঞ্চলিক প্রভাব স্পষ্ট। হায়দরাবাদের হালিম আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। পুরান দিল্লি ও লখনউয়ের বাজারে ইফতারকে ঘিরে জমে ওঠে বিশেষ খাদ্য উৎসব।

সেহরি অনেক সময় আগের রাতের ভারী খাবার দিয়েই সেরে নেওয়া হয়। তবে ফল ও দুগ্ধজাত খাবারের ব্যবহারও বাড়ছে।

পাকিস্তান: রমজান ট্রান্সমিশনের আমেজ

পাকিস্তানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিশেষ রমজান অনুষ্ঠান জনপ্রিয়। ইফতারের আগে ফলের চাট ও পাকোড়া প্রায় প্রতিটি ঘরেই দেখা যায়।

রূহ আফজা শরবত রমজানের প্রতীকী পানীয় হয়ে উঠেছে। বড় শহরগুলোতে রাস্তার ধারে ইফতার স্টল বসে।

মিসর: ফানুসের আলোয় রমজান

মিসরে রমজান মানেই রঙিন ‘ফানুস’ (লণ্ঠন)। সেহরিতে ফুল মেদামেস জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাবার।

ইফতারে কোশারি ও মোলোকিয়া ছাড়াও নানা ধরনের মিষ্টান্ন বিক্রি হয়। রমজানকে ঘিরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়।

ইন্দোনেশিয়া: ‘নগাবুবুরিত’ সংস্কৃতি

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারের আগে ‘নগাবুবুরিত’ নামে বিকেলের সময় কাটানোর সংস্কৃতি রয়েছে।

ইফতারে কলাক পিসাং ছাড়াও নানা ভাজাপোড়া ও ভাতের পদ পরিবেশন করা হয়। মসজিদে সম্মিলিত ইফতারের প্রচলনও রয়েছে।

নাইজেরিয়া: আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

নাইজেরিয়ায় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে খাবারের ভিন্নতা রয়েছে। উত্তরে শিম ও শস্যভিত্তিক খাবার বেশি, দক্ষিণে ভাত ও মাংসের পদ জনপ্রিয়।

রমজান মাসে সামাজিক সহায়তা ও দান-খয়রাতের প্রবণতা বাড়ে।

মালয়েশিয়া: রমজান বাজারের উচ্ছ্বাস

মালয়েশিয়ায় ‘বাজার রমাদান’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিকেল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্টল বসে।

বাবুর লাম্বুক অনেক সময় মসজিদ থেকে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।

বাংলাদেশ: ঐতিহ্য, স্বাদ ও সম্প্রীতি

বাংলাদেশে রমজান মানেই পারিবারিক বন্ধন ও পরিচিত স্বাদের টান। সেহরিতে ভাত, ডাল, মাছ-মাংস, ভর্তা জনপ্রিয়। শহরে স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে হালকা খাবারের প্রবণতাও বাড়ছে।

ইফতারে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ ও হালিম অপরিহার্য। পুরান ঢাকার ইফতার ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময়। লেবুর শরবত, বোরহানি ও তোকমা শরবত জনপ্রিয় পানীয়।

একই চেতনা, ভিন্ন স্বাদ

দেশভেদে উপকরণ ও রান্নার ধরন আলাদা হলেও সূর্যাস্তে প্রথম খেজুর মুখে দেওয়ার অনুভূতি সবার জন্যই এক। মরক্কোর হারিরা, দক্ষিণ এশিয়ার হালিম, সৌদি আরবের কাবসা কিংবা ইন্দোনেশিয়ার কলাক—সবকিছু মিলিয়ে রমজান বিশ্বজুড়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরি করে।

সূত্র: কার্লিটেলস

Leave a Reply

scroll to top