রোববার ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।
ভূপাতিত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে উদ্ধারের ঘটনাকে নিঃসন্দেহে একটি প্রচারণাগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ৪৮ ঘণ্টার এই নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ আবারও মনে করিয়ে দেয়—পরাজিত না হওয়া ইরান এখনও পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
এটি হোয়াইট হাউসের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কোনো দ্বীপ দখলের জন্য স্থল অভিযান চালানোর চিন্তা থাকলে, কিংবা ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধারের মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলে ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে বোমা হামলা এতটাই একতরফা ছিল যে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ সপ্তাহ পর একটি মাত্র যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং স্মরণীয়। সর্বশেষ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের হাতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল।
এফ-১৫ই কীভাবে ভূপাতিত হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ঘটনাটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশসীমার আধিপত্য পুরোপুরি নিরঙ্কুশ নয়, যদিও তারা প্রতিদিন ইরানে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ বার বোমা হামলা চালাচ্ছে।
একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগলের মূল্য প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলার, নতুন হলে তা ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এর চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল উদ্ধার অভিযানটি—যেখানে প্রকৃত সমস্যার সূচনা হয়।
ইসফাহানের দক্ষিণে একটি পরিত্যক্ত ইরানি বিমানঘাঁটিকে অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হয়, যখন দুটি সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান মাটিতে আটকে পড়ে।
মার্কিন সূত্র জানায়, সেগুলো ইরানের হাতে পড়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ধ্বংস করে। আহত দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে উদ্ধারের জন্য আরও পরিবহন বিমান আনা হয়। পরিবর্তিত এই হারকিউলিস বিমানের প্রতিটির মূল্য প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া একটি এইচএইচ-৬০ পেভ হক হেলিকপ্টারও গুলিবিদ্ধ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ধারণা করা যায়, শুধু এই উদ্ধার অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানো বিমানগুলোর মোট ক্ষতি ২৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব বড় নয়। যুদ্ধের অংশ হিসেবেই বিমান হারানো বা দুর্ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২১৮টি এফ-১৫ই এবং বিশেষ বাহিনীতে ৫৫টি সি-১৩০ বিমান ছিল।
তবে পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার অভিযান চালানো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যাতে ইরান কোনো ক্রু সদস্যকে আটক করতে না পারে। যদি একজন বা দুজনকেও আটক করা হতো, তবে তা তেহরানের জন্য বড় প্রচারণা সাফল্যে পরিণত হতো। ১৯৭৯–৮০ সালের মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের স্মৃতি আবারও সামনে চলে আসত, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জন্য বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
এই বিষয়টি ট্রাম্প নিজেও জোর দিয়ে বলেছেন—যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কোনো সৈন্যকে ফেলে যাবে না। এটি আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি হলেও এর অর্থ হলো, প্রতিবার এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ঝুঁকি ও ব্যয় বহন করতে হবে।
এই ঘটনায় ইরানি বাহিনী এফ-১৫ই-এর কোনো ক্রু সদস্যকে খুঁজে পায়নি। তারা ইসফাহানের দক্ষিণের ওই বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি—সম্ভবত আকাশে ভাসমান রিপার ড্রোনের কারণে, যা তিন কিলোমিটারের মধ্যে আসা যেকোনো ইরানি ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করতে প্রস্তুত ছিল বলে মার্কিন ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে।
তবে উদ্ধার অভিযানের সি-১৩০ বিমান ধ্বংস বা হারানোর ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ঝুঁকি কতটা বেশি হতে পারে। প্রশ্ন থেকে যায়—যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী কি সত্যিই ইসফাহানে ভূগর্ভে সংরক্ষিত প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই তা সরিয়ে আনতে পারবে?
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১৫ হাজারের বেশি বোমা হামলার পর ইরান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবুও তেহরান তুলনামূলক ছোট কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি ক্ষতিকেও বড় প্রচারণা সাফল্যে রূপ দিতে পারে, কারণ এমন ক্ষতি খুব কমই ঘটে। অসম যুদ্ধে দুর্বল পক্ষের জন্য একবার সফল হওয়াই অনেক সময় যথেষ্ট।





