ওয়ান-ইলেভেনের তিন কুশীলব মুখোমুখি, জিজ্ঞাসাবাদে বের হচ্ছে নতুন তথ্য

IMG_20260401_232154.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

সেনা-সমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ (১/১১) সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। আদালতের অনুমতিতে দ্বিতীয় দফায় তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তাদের মুখোমুখি বসিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পর্বে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকসহ বহু ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে অর্থ আদায়, গুম ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে এসব সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসাবাদের অংশ হিসেবে তাদের বিভিন্ন ‘প্লেস অব অকরেন্স’—যেগুলো নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত—সেসব স্থানেও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ওই সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করলেও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের গ্রেফতারের পর ভুক্তভোগীরা এখন ডিবি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে শুরু করেছেন।
গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, আইনগত ব্যবস্থা নিতে হলে লিখিত অভিযোগ ও মামলা দায়ের করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুক্তভোগী ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন এবং তাদের আনুষ্ঠানিক মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই নতুন মামলা দায়ের হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পুরো অভিযানের মূল সমন্বয়কারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সে সময় তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নিয়মিত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) যাতায়াত করতেন।
দুদক সূত্র জানায়, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রকাশ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
অভিযোগ রয়েছে, দুদকের মামলায় কাউকে রিমান্ডে নেওয়া সম্ভব না হলে পুলিশের করা অন্য মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন ও অর্থ আদায় করা হতো। জরুরি অবস্থার সময় সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ ছিল না বলেও জানিয়েছেন দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এদিকে, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর নামে অতিরিক্ত ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা করেছে দুদক। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করলে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আগামী ৯ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগে বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক মামলায় গ্রেফতার দেখাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তথাকথিত ‘সেইফ হাউজ’ ও নির্যাতনকেন্দ্রগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর মামুন খালেদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রেক্ষাপটে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকা এই সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে ব্যাপক আলোচিত হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ রাতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতার হন। এরপর ২৫ মার্চ রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় শেখ মামুন খালেদকে এবং ৩০ মার্চ গ্রেফতার হন আফজাল নাছের।

Leave a Reply

scroll to top