ভেজাল তেলে আয়ু কমছে গাড়ি-বাইকের

cd804adc-76fc-47aa-be86-392764b9358e-mmdm0dhd2xh4dfe-20260305211826.webp
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা দিবারুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঢাকার যানজটের ঝক্কি থেকে রেহাই পেতে তিনি নিজের মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। বছর না ঘুরতেই তিনি লক্ষ্য করেন, বাইকের জ্বালানি খরচ বেড়ে গেছে এবং ইঞ্জিন বেশি গরম হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, চলার পথে হঠাৎ বাইক বন্ধ হয়ে যায়। আবার কখনও দেখা যায়, বাইক চালু হতে চায় না। সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি একাধিকবার মিস্ত্রির কাছে যান। কার্বুরেটর পরিষ্কার করার পর কয়েকদিন ভালো চললেও আবার একই সমস্যা দেখা দেয়।

শেষ পর্যন্ত মিস্ত্রির পরামর্শে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে নতুন কার্বুরেটর বসান তিনি। কিন্তু তিন মাসের মধ্যে আবারও একই সমস্যা দেখা দেয়। মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, নিম্নমানের তেল ব্যবহারের কারণে কার্বুরেটরে ময়লা জমে এমন সমস্যা হচ্ছে।

দিবারুল আলম বলেন, আগে তার বাইক প্রতি লিটার তেলে ৩২ থেকে ৩৫ কিলোমিটার চলত, এখন চলে প্রায় ২৮ কিলোমিটার। ট্যাংকির ভেতর জং ধরেছে। মিস্ত্রি ট্যাংকি খুলে কয়েকদিন বিশেষভাবে পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন। না করলে ট্যাংকি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, কোন পাম্পের তেল ভালো তা বোঝা কঠিন। নিম্নমানের তেল সরবরাহ বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

রাজবাড়ীর বাসিন্দা শ্রাবণ রাজ একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতেন। শুরুতে প্রতি লিটার তেলে প্রায় ১৪ কিলোমিটার চললেও কয়েক বছর পর তা কমে আট কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। পাশাপাশি গাড়িতে নানা সমস্যা দেখা দেয়। তিনি জানান, গাড়ির ইঞ্জিনে সমস্যা হতো, জ্বালানি যাওয়ার পথের অংশে ময়লা জমত এবং ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়ে যেত। পরে বাধ্য হয়ে তিনি গাড়িটি বিক্রি করে দেন।

যশোরের পারভেজ আলম জানান, নতুন মোটরসাইকেল কেনার সাত থেকে আট মাস পরই জ্বালানি ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়। সার্ভিস করিয়েও সমাধান না পেয়ে মিস্ত্রির পরামর্শে বাইক বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাবি বন্ধ করে রাখতে হয়।

মিস্ত্রিরা বলছেন, তাদের কাছে মেরামতের জন্য আসা অনেক মোটরসাইকেল ও গাড়িতে একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ঢাকার কাঁটাবনের এক মিস্ত্রি মোজাফফর বলেন, অনেকেই জ্বালানি ব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে আসেন। ঠিক করার কিছুদিন পর আবার সমস্যা দেখা দেয়। তার মতে, নিম্নমানের তেল ব্যবহারের কারণেই এসব সমস্যা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের তেলে অনেক সময় পানি, রাসায়নিক পদার্থ বা সস্তা তেল মেশানো থাকে। এতে ইঞ্জিনের জ্বালানি দহন ঠিকমতো হয় না। ফলে শক্তি কমে যায় এবং জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়। ইঞ্জিনের ভেতরে কালো কালি জমে এবং জ্বালানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে গাড়ি চালু হতে দেরি হওয়া, ধোঁয়া বের হওয়া কিংবা শক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

এ ছাড়া ঠিকমতো দহন না হওয়ায় অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়। এতে ইঞ্জিনের ধাতব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ট্যাংকির ভেতর জং ধরতে পারে। দীর্ঘ সময় এ ধরনের তেল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব কমে যায়।

দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। আমদানির পাশাপাশি বিভিন্ন শোধনাগার থেকে তেল সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে তেল বিতরণ করা হয়। এ জন্য দেশে মোট ৪৭টি ডিপো রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ডিপোতে তেল চুরির পর ঘাটতি পূরণ করতে তেলের সঙ্গে অন্য পদার্থ মেশানো হয়। আবার কোথাও কোথাও নিম্নমানের তেল সংগ্রহের অভিযোগও আছে। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ভোক্তারা।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ডিলাররা ডিপো থেকে যে তেল পান সেটিই বিক্রি করেন। এ বিষয়ে তারা কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছেন, কিন্তু তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, অভিযোগ পেলে নমুনা পরীক্ষা করা হবে। কোথাও অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন পাম্পের তেল পরীক্ষা করে কোথাও কোথাও নিম্নমানের তেল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. এহসান বলেন, দেশে নিম্নমানের তেলের সমস্যা নতুন নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে তেল চুরি হলে ঘাটতি পূরণে অন্য পদার্থ মেশানো হয়। এতে ইঞ্জিনে কার্বন জমে এবং যন্ত্রাংশের ক্ষতি হয়।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম বলেন, যথাযথ নজরদারির অভাব ও দুর্নীতির কারণে এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকেই।

 

Leave a Reply

scroll to top