পাগড়ি খুঁজছেন? সঙ্গীতা শীলের ‘পাগড়ি বাঁধাই’ হতে পারে ভরসা

pagri_badhai_5.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক ফিচার ডেস্ক

সাত মাস বয়সী শিশুর জন্য কোমল গড়নের পাগড়ি হোক কিংবা আশি বছরের বৃদ্ধের জন্য রুচিসম্মত বাঁধাই—বয়স, প্রয়োজন ও উপলক্ষ অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় সব চাহিদা পূরণ করে চলেছে সঙ্গীতা শীলের উদ্যোগ ‘পাগড়ি বাঁধাই’।

অনলাইনে এখনো অনেকেই সঙ্গীতাকে ‘ভাইয়া’ ভেবে ভুল করেন। পাগড়ির দাম জানতে গিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন আসে—‘পাগড়ি বাঁধার ভাইয়াটা কোথায়?’ সঙ্গীতা তখন হাসিমুখে জানান, তিনি ভাইয়া নন; বরং ‘পাগড়িওয়ালি আপু’। একজন নারী হয়ে পাগড়ি বাঁধার মতো কাজ করছেন—এ বাস্তবতা এখনো অনেকের কাছে বিস্ময়ের। আর সেই বিস্ময়ই ধীরে ধীরে তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিয়ের আয়োজনে বরের সাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পাগড়ি। এটি কেবল একটি পোশাক নয়; বরং মর্যাদা, পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এই ঐতিহ্যকে পেশাদার দক্ষতা ও নান্দনিকতার সঙ্গে ধরে রাখার কাজটি ২০১১ সাল থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছেন সঙ্গীতা শীল।

শুরুতে শখের বশে শুরু হলেও, আজ ‘পাগড়ি বাঁধাই’ তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

২০১১ সালে ঢাকায় ভারতীয় পোশাক ব্র্যান্ড ‘মান্যবর’-এ সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ শুরু করেন সঙ্গীতা। সেখানেই প্রথম পাগড়ি বাঁধার সঙ্গে পরিচয়। অন্যদের মতো বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে পাগড়ির ভাঁজ, গঠন ও নান্দনিকতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।

এরপর শুরু হয় অনুশীলন—কখনো পুতুলের মাথায়, কখনো নিজের মাথায়। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ দক্ষতায় রূপ নেয়, আর দক্ষতা পেশায়। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী পাগড়ি শিল্পীদের মধ্যে তার নাম অন্যতম।

শুরুর সময় কোনো পুঁজি ছিল না। গ্রাহকরা নিজেরাই কাপড় এনে দিতেন, আর সঙ্গীতা নিতেন কেবল শ্রমের পারিশ্রমিক। পরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে নিজের সংগ্রহ তৈরি করেন। ফ্যাব্রিক, ব্রোচ, পালক ও পুঁতির সংযোজনে ধীরে ধীরে তার কাজ পেশাদার রূপ পায়।

বর্তমানে সঙ্গীতা দুই ধরনের পাগড়ি নিয়ে কাজ করেন—

হাতে বাঁধা পাগড়ি: বরের বাসা বা ভেন্যুতে গিয়ে সরাসরি পাগড়ি পরিয়ে দেন।

রেডিমেড পাগড়ি: নির্দিষ্ট ফ্রেমে তৈরি, যা সহজে খোলা ও পুনরায় পরা যায়।

ইনডোর-আউটডোর যাতায়াত বেশি থাকলে রেডিমেড পাগড়ি বেশ সুবিধাজনক। তবে দুই ক্ষেত্রেই তার মূল লক্ষ্য থাকে নিখুঁত নকশা ও সঠিক ফিটিং।

তার কাজের বিশেষত্ব হলো—প্রতিটি পাগড়িই কাস্টমাইজড। বরের মাথার মাপ, পছন্দের রঙ ও ডিজাইন অনুযায়ী আলাদাভাবে তৈরি করা হয়।

রাজস্থানি, গুজরাটি বা জয়পুরি স্টাইলের পাগড়ি তৈরি করলেও সঙ্গীতা দেশি ফ্যাব্রিক—সিল্ক, ভেলভেট, মসলিন—ব্যবহার করেন। একটি রেডিমেড পাগড়ি তৈরিতে প্রায় ছয় গজ কাপড় লাগে।

হাতে বাঁধা পাগড়ি করতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট, আর একটি রেডিমেড পাগড়ি তৈরি করতে লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো। ব্যস্ত সময়ে দিনে চার-পাঁচটি পাগড়ি তৈরি করতে পারেন তিনি।

নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই সময়টাই সঙ্গীতার সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।

বর্তমানে পাগড়ির ব্যবহার শুধু মুসলিম বরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অনেক হিন্দু বরও এখন বিয়ের সাজে পাগড়ি যুক্ত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ফটোশুটে পাগড়ি এবং মণ্ডপে টোপর—এভাবে বরের দুটি আলাদা লুক তৈরি হয়।

একজন নারী হিসেবে এই পেশায় আসা সহজ ছিল না। ‘পাগড়ি তৈরি কি মেয়েদের কাজ?’—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার। তবে একজন নারী গ্রাহকের অনুপ্রেরণাই তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

২০১৭ সালে তিনি ‘পাগড়ি বাঁধাই’ নামে একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন। বর্তমানে এটিই তার প্রধান ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম।

হাতে বাঁধা পাগড়ি: সার্ভিস চার্জ ৪,০০০ টাকা , কাপড়সহ: ৬,০০০–৬,৫০০ টাকা, রেডিমেড পাগড়ি: সার্ভিস চার্জ ২,৫০০ টাকা , কাপড়সহ: প্রায় ৩,৫০০ টাকা ।

ঢাকার ভেতরে সঙ্গীতা নিজেই পাগড়ি পৌঁছে দেন। তার মতে, পাগড়ি শুধু একটি পণ্য নয়—এটি একটি শিল্পকর্ম। তাই ফিটিং ও ব্যবহারের নির্দেশনাও তিনি নিজেই বুঝিয়ে দেন।

এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি বরের পাগড়ি নিজ হাতে বেঁধেছেন সঙ্গীতা। পরিবার-পরিজন মিলিয়ে সংখ্যাটি দুই হাজার ছাড়িয়েছে বলে তার ধারণা।

ভবিষ্যতে ‘পাগড়ি বাঁধাই’-কে একটি পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ওয়েডিং ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি। তার লক্ষ্য—পাগড়ি, কোমরবন্ধ, জুয়েলারি ও শেরওয়ানিসহ বরের সাজের সবকিছু এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা।

 

Leave a Reply

scroll to top